বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের উদ্বোধনী ভাষণ দিয়েছেন সে দেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন। ৪৮ ঘন্টা পার হলেও তাঁর ভাষণ নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত। এমনিতেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকেই তাঁর অবস্থান নিয়ে বিভিন্ন পক্ষ বিভিন্ন সমালোচনা করে আসছেন। পরে তিনি নিজেই দুটি সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে নানা বিস্ফোরক মন্তব্য করে খবরের শিরোনামে এসেছেন। এবার শিরোনামে সংসদের প্রথম অধিবেশনে ভাষণ দিয়ে। কি এমন বললেন তিনি, কেনই বা বিতর্ক?
শুধু স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্যই নয়, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন তাঁর ভাষণের শুরুতেই শেখ হাসিনা সরকারের জমানাকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার অবসানের পর একটি নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়েছে। বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে অবাধ ও নিরপেক্ষ।
বাইট – মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু, রাষ্ট্রপতি
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এমনই এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি তিনটি ভিন্ন সরকারের সময়েই তাঁদের প্রশংসা করে বক্তব্য দিলেন। মজার বিষয় হল, এই তিনটি সরকারই আওয়ামীবিরোধী রাজনীতি করে আসছে, আর সাহাবুদ্দিন চুপ্পু নিজে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতন হয়েছিল। এরপর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসে। ইউনূস এবং উপদেষ্টাদের শপথের সময়ও মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন স্বাগত ভাষণ দিয়েছিলেন। সরকারের পতনের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতাদের মধ্যে যাঁরা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হন, তাঁদের শপথ বাক্য পড়িয়েছিলেন। বরং এই ছাত্রনেতারা শুরু থেকেই তাঁর অপসারণ দাবি করেছেন। এমনকি এবারও রাষ্ট্রপতির ভাষণের সময়ও জামায়াত ও এনসিপি ওয়াকআউট করে বেরিয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু তাঁর ভাষণে সেই গণআন্দোলনের গুণকীর্তণ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। তিন বছর আগে যে দল মোহম্মদ সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করেছিল, সেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এখন নিষিদ্ধ। ক্ষমতায় বিএনপি। প্রসঙ্গত, মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি করেছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। সে সময় শেখ হাসিনার পায়ের ধুলো পেলে নিজেকে গর্বিত মনে করতেন তিনি।
এই মোহম্মদ সাহাবুদ্দিনই একসময় সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এমনকি আজকের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে নিয়েও নানা কটু কথা বলতে অভ্যস্ত ছিলেন।
আজীবন আওয়ামী লীগের চেতনা ধারণ করা সাহাবুদ্দিন চুপ্পু আজ অবলীলায় আওয়ামী লীগের দুর্নীতি ও অপশাসনের কথা নিজের বক্তব্যে তুলে ধরলেন। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, রাষ্ট্রপতি সম্ভবত নিজের পদ ধরে রাখার জন্যই সচেষ্ট। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি। এই পাঁচ বছর বাংলাদেশ দুর্নীতিতে গোটা বিশ্বের মধ্যে এক নম্বর স্থানে ছিল বলেই দাবি করেছিলেন সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। আজ তিনিই বলছেন, শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগের সরকার দুর্নীতিতে দেশকে শিখরে নিয়ে গিয়েছে। তাঁর এই স্বভাবতই রাষ্ট্রপতির এই ভাষণে আওয়ামী বিদ্বেষ শোনার পরই বাংলাদেশের নেটিজেনদের তুমুল প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সোশ্যাল মি়ডিয়ায় রাষ্ট্রপতিকে তীব্র কটাক্ষ করতে ছাড়ছেন না কেউ। কারও দাবি, রাষ্ট্রপতি সুবিধাবাদী, কেউ বলছেন রাষ্ট্রপতি পাল্টিবাজ। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সাধারণত রাষ্ট্রপতির ভাষণে কি বলবেন তা ঠিক করে দেয় সরকারপক্ষ। তাই যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকে তাঁদের ভাষায় কথা বলতে হয় রাষ্ট্রপতিকে। সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকেও তাই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে নিজের ভাষণকেও পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু তারপরও বিতর্ক থামছে না, প্রশ্ন উঠছে একজন একনিষ্ঠ আওয়ামী কর্মী হয়েও কিভাবে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বললেন। আবার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবরের বদলে তিনি কিভাবে জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বললেন, তা নিয়েই হতবাক হচ্ছেন বাংলাদেশের নেটিজেনরা।












Discussion about this post