ইউনূস ক্ষমতায় আসীন হওয়ার সময় ভর করেছিলেন সেই সব নেতাদের যাদের তাঁর মনে হয়েছিল সরকারের সঙ্গেও তারা সাথ দেবে। সরকার বিদায় নেওয়ার পরেও তাঁরা তাঁর সঙ্গে থাকবে। কিন্তু রাজনীতিতে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলে কিছু হয় না। তাই, পালাবদল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তারাও তাদের অবস্থান বদল করতে শুরু করেন। আর তাঁদের এই অবস্থান বদলে এখন সব থেকে বেশি ফ্যাসাদে পড়েছেন ইউনূস কোম্পানি। খলিলুর রহমানের কথাই ধরা যাক। তিনি ছিলেন ইউনূসের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন। তখন তার অবস্থান আর এখন তাঁর অবস্থান একেবারে আলাদা। বোঝাই যাবে না, তিনি একসময় ইউনূসের মিত্র ছিলেন। এখন তাঁর শরীরের ভাষা, মুখের ভাষা সব কিন্তু বিএনপির পক্ষে। আসিফ মাহমুদের কথাই ধরা যাক। পূর্বতন সরকারের তিনি অত্যন্ত একজন ঘনিষ্ঠ নেতা হিসেবেই পরিচিত ছিলেন। সরকার বিদায়ের পর তিনি এখন তাঁর খোলনলচে সব বদলে ফেলেছে। এখন তাঁকে কখনও তদারকি সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে দেখা যাচ্ছে। কখনও তাঁকে দেখা যাচ্ছে ডিপ স্টেটের বিরুদ্ধে কথা বলতে। সম্প্রতি তিনি সাংবাদিক সম্মেলনে যা বলেছেন, তা হাটে হাঁড়ি ভাঙার সমান।
এই এনসিপি মুখপাত্র বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৯ সাল পর্যন্ত যাতে ক্ষমতায় থাকতে পারে, তার একটা রোডম্যাপ ডিপ স্টেট তৈরি করে দিয়েছিল। গত দেড় বছর ধরে কিন্তু বাংলাদেশে এই ডিপ স্টেট নিয়ে বহুবার আলোচনা হয়েছে। এমনকী হাসিনার মুখেও শোনা গিয়েছিল ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্রের কথা। ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর হাসিনা বহু গণমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। প্রথম দিকের সাক্ষাৎকারগুলিতে কিন্তু আমেরিকার বিরুদ্ধে তাঁকে ততটা সরব হতে দেখা যায়নি। পরবর্তীকালে তিনি সরাসরি আমেরিকার বিরুদ্ধে আঙুল তুলেছিলেন। বলেছিলে, ডিপ স্টেটের দাবি মেনে তিনি সেন্ট মার্টিন দ্বীপ আমেরিকার হাতে তুলে দিলে তাঁকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হত না। বছরের পর বছর তিনি বাংলাদেশের মসনদে থেকে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি দেশের স্বাধীনতা বিসর্জন দিয়ে আমেরিকার গোলামি করতে নারাজ।
বাংলাদেশে ভোট, বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন, তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হওয়া – এই সব কিছু ডিপ স্টেটকে অনেটা পিছনের সারিতে ঠেলে দিয়েছিল। আসিফ মাহমুদ আবার নতুন করে সেই প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। ফলে, জাতীয় রাজনীতিতে আবার ডিপ স্টেটের ষড়যন্ত্র নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, আসিফ যা বলেছেন, সেটা কি নজর ঘোরাতে? না কি আসল সত্যটাই বলেছেন? আসিফ মাহমুদ কোনও ছোট-খাটো নেতা নন। জুলাই আন্দোলনের প্রধান মুখ ছিলেন তিনি।
কী বলেছেন এই জুলাই যোদ্ধা? সাংবাদিক সম্মেলনে তিনি বলেন, ইউনূসের সরকার যাতে ২০২৯ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থেকে যেতে পারে, তার জন্য খোদ আমেরিকা তাদের একটা স্ট্র্যাটেজি সাজিয়ে দিয়েছিল। ডিপ স্টেটের তরফে তাদের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল হাসিনার মেয়াদ আছে ২০২৯ পর্যন্ত। সেই মেয়াদ তারা শেষ করুক। আমেরিকা ই ব্যাপারে তাদের সাহায্য করে যাবে। তবে প্রস্তাবের সঙ্গে আমেরিকা বেশ কিছু শর্তও জুড়ে দেয়।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, হাসিনা সরকারের পরিবর্তন দরকার ছিল। একটি দল দীর্ঘ দিন ক্ষমতায় থাকলে সেই দলে পচন ধরে। ব্রিটেনের ইতিহাসবিদ লর্ড অ্যাকশন বহু বছর আগে বলেছিলেন, Power tends to corrupt, and absolute power corrupts absolutely. তবে যে কায়দায় হাসিনাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা দেখে কিন্তু অনেকে সেই সময় জোর গলায় বলেছিলেন এটা গোটাটাই একটা চক্রান্ত। আর আসিফ মাহমুদের বক্তব্য সেটা এখন দিনের আলোর মতো স্বচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। ইউনূস সরকার ডিপ স্টেটের অংশ। কিন্তু সেনাবাহিনী আর বিএনপির নির্বাচনীর দাবি তদারকি সরকারের সেই পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়েছে।











Discussion about this post