ইতিহাসের চাকা সব সময় ঘোরে। তবে প্রতিবার সেই ঘূর্ণনের আওয়াজ কানে যায় না। এটা সব দেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। বিএনপি একসময় ক্ষমতায় ছিল। তাদের ক্ষমতা থেকে সরেও যেতে হয়েছে। আবার সেই বিএনপি ক্ষমতা পুনর্দখল করেছে। তাদের এই প্রত্যাবর্তন নিয়ে নানা প্রান্ত থেকে নানা ধরনের মতামত দেওয়া হয়েছে। আগামীদিনেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা তাঁদের মত করে মত প্রকাশ করবেন। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে তারেককে ক্ষমতায় আসীন করার পিছনে হাত ছিল আমেরিকার। হাত ছিল ভারতেরও। কিন্তু দেশবাসীর ভোট না পেলে তারেক যে কোনওভাবেই ক্ষমতায় আসীন হতে পারতেন না। ক্ষমতায় আসীন হয়েছে এক মাস হল। ইতিহাসের চাকা ঘুরে যাওয়ার ফলেই এটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে।
প্রসঙ্গ উত্থাপনের কারণ মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। এই প্রসঙ্গে এটা বলাও প্রয়োজন। ক্ষমতার অপব্যবহার করলে তাকে তাঁর মূল্য দিতে হয়। সেই মূল্য কোনও কোনও সময় চরমে পৌঁছায়। মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তাঁর বড়ো প্রমাণ। অভিযোগ, এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী একসময় বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে ক্ষমতার ছড়ি ঘোরাতেন। তারেক রহমানকে গ্রেফতার করে সেনা সদরে তুলে নিয়ে গিয়ে তাঁর ওপর চরম শারীরিক নির্যাতন চালান। সেই নির্যাতন এতটাই ভয়ংকর ছিল যে বেগম জিয়া পুত্রের মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে গিয়েছিল। এর জন্য আমাদের কিছু সময়ের জন্য টাইম মেশিনে চেপে ১৮ বছরের জন্য পিছনে চলে যেতে হবে।
সালটা ২০০৭। তারিখ ১১ জানুয়ারি। বঙ্গভবনের ঘড়িতে তখন কাঁটায় কাঁটায় বিকেল চারটে। রাজধানী ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছে সাঁজোয়া গাড়ি। রাষ্ট্রপতি পদে আসীন ইয়াজুদ্দিন আহমেদ। সেনাবাহিনীর লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে একটি দলিলে চাপ দিয়ে সই করিয়ে নেওয়া। কে যাচ্ছিলেন বঙ্গভবনের দিকে? রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ। তবে তিনি আসল খলনায়ক নন। পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়ছিলেন মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী। ১ /১১-য়ের তিনি ছিলেন কিংমেকার। তিনি বাংলাদেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেত্রীকে জেলের ভাত খাইয়ে ছিলেন। এদের মধ্যে একজন প্রয়াত। তিনি খালেদা জিয়া। আর হাসিনা বর্তমানে রয়েছেন দিল্লিতে। অনেকেই বলছেন, হাসিনা খুব বেশিদিন দিল্লিতে থাকতে চাইছেন না। কারণ, সামনেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন। ইতিহাসের চাকা এতটাই প্রবলভাবে ঘুরে গিয়েছে যে এই মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে এখন জেলের ভাত খেতে হচ্ছে। কারণ, তার বিরুদ্ধে মানব পাচারের অভিযোগ রয়েছে। যদিও কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে, তারেক রহমান এখন তাঁর পুরনো জ্বালা মিটিয়ে নিচ্ছেন। হাসিনা ও জিয়াকে যিনি জেলে ঢুকিয়ে ছিলেন, এখন তিনি নিজেই চার কুঠুরিতে বন্দী।
পরিচয় করিয়ে দেওয়া যাক প্রাক্তন এই সেনাকর্তার সঙ্গে। ২০০৭ –য়ের শুরুর দিকে মাসুদ চৌধরীর সাভারের নয় পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কম্যান্ডিং (জিওসি) ঢাকা দখলের চাবি কাঠি থাকে এখানেই। সেই সময় সেনাপ্রধানপদে মইন ইউ আহমেদ। বাংলাদেশের পরিস্থিতি তখন টাল-মাটাল। সেনাপ্রধান চরম সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছিলেন। আবার পর্দার পিছনে চলে যান মাসুদ। আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়তে শুরু করেন। বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতার চাবিকাঠি ছিল তাঁর হাতে। সেনাবাহিনী ততক্ষণে বঙ্গভবন ঘিরে ফেলেছে। আর বঙ্গভবনের ভিতরে চলছিল বৈঠক। রাষ্ট্রপতি ইয়াজুদ্দিন ইস্তফা দিতে চেয়েছিলেন। তাতে ঘোরতর আপত্তি তোলেন প্রাক্তন এই সেনাকর্তা। তিনি ইয়াজুদ্দিনকে দিয়ে আদেশনামায় সই করিয়ে নেন। আর ইয়াজুদ্দিন বাধ্য হয়ে ইস্তফা দেন।
দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। হাসিনা প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন হন। অনেকেই ধরে নিয়েছেলন এই অত্যাচারী সেনাকর্তার বিচার হবে। কিন্তু মাসুদ অত্যন্ত ধুরন্ধর। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করে নেন। হয়েছিল পদোন্নতি। করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার হাইকমিশনার। এমনকী জাতীয় পার্টির এমপি পদও বাগিয়ে নিয়েছিলেন। আর তার সুবাদে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন এই প্রাক্তন সেনাকর্মকর্তা। তাঁর বিরুদ্ধে ২৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তিনি চেয়েছিলেন হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ এবং জিয়া সহ বিএনপিকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিতে। এই পরিকল্পনার নাম দেওয়া হয়েছিল মাইনাস ২ ফর্মুলা। কিন্তু সেই ফর্মুলা কাজে আসেনি। তিনি এখন জেলে।











Discussion about this post