যুদ্ধের প্রভাব শুধুমাত্র দুই দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। সরাসরি প্রভাব না পড়লেও পরোক্ষভাবে প্রভাব পড়ে সর্বত্র। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান বুঝে গিয়েছিল, ওয়াংশিংটনকে শুধুমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জবাব দিলে হবে না এমন কিছু করতে হবে, যাতে দেশটির অর্থনীতির প্রাণ ভোমরাকে খতম করা। প্রথম তারা ধাক্কা দিয়েছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যোগ করেছে ৩৪ কিলোমিটার সরু জলপথ। সরু পথ দিয়ে পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। ইরান এই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার নিয়ে নতুন শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। সেই শর্ত হল যে সব তেলবাহী জাহাজ চিনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন করবে, তাদের এই প্রণালী দিয়ে যেতে দেওয়া হবে। কিন্তু ইরান এই কেন এই শর্ত চাপালো। উদ্দেশ্যে ডলার আধিপত্যবাদকে খর্ব করা। তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। মাসের পর মাস তেল আমদানি বন্ধ থাকলে যে কোনও দেশের অর্থবাজার অস্থির হয়ে উঠবে। কোনও দেশ সেটা চাইবে না। তারা যদি তেল ক্রয় বিক্রয়ে ইউয়ান ব্যবহার করতে শুরু করে তাহলে তেলের বাজারে ডলারের নিয়ন্ত্রণ দূর্বল হবে। রাশিয়াও কিন্তু একসময় তেল বিক্রি করত রুবলে। অপরদিকে চিন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে। তেহরানের শর্ত মেনে দেশগুলি যদি চিনের মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে, তাহলে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃতি পাবে। দূর্বল হবে ডলার।
শুধু ডলার দূর্বল হয়নি। বহু দেশের মুদ্রায় মূল্য হ্রাস পেয়েছে। আর্থিক দিক থেকে যে সব দেশ শক্তিশালী, সেই সব দেশের ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব যে একেবারে পড়েনি, তা নয়। প্রভাব পড়েছে। তবে সেটা ততটা দৃশ্যমান নয়। যতটা দৃশ্যমান তুলনামূলকভাবে আর্থিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা দেশের ক্ষেত্রে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। এবং সেটা বেশ ভয়াবহ। দক্ষিণ এশিয়া যে কটি দেশ অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল, তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। পূর্বতন তদারকি সরকারের আমলে দেশটি আর্থিক দিক থেকে খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের আবহে বাংলাদেশ গভীর খাদে গিয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় নতুন করে একটি ভয়াবহ বার্তা দিল বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প অ্যাসোসিয়েশন। তারা একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, সারা দেশে পাম্পগুলোর অবস্থা বেশ করুণ। বর্তমানে তেল কোাম্পানিগুলি থেকে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হচ্ছে, তা দিয়ে ক্রেতাদের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। রবিবার ২২ মার্চ রাতে পেট্রোলপাম্প মালিকদের সংগঠন তাদের ফেসবুক পেজে বিবৃতি জারি করে জানিয়েছে, এই সংকটের কথা। পর্যাপ্ত তেল না পাওয়ায় প্রতিটি পেট্রোলপাম্পের কর্মীদের সঙ্গে ক্রেতাদের কথাকাটাকাটি লেগেই রয়েছে। কোনও কোনও প্রান্ত থেকে হাতাহাতির খবরও এসেছে। পরিস্থিতির সঙ্গে না যুঝতে পারছেন পেট্রোলপাম্প মালিক থেকে কর্মীরা, না ক্রেতার।
বাংলাদেশ পেট্রোলপাম্প অনার্স অ্যাসোসিয়েশনের ফেসবুক পেজে সংগঠনের সভাপতি সৈয়দ সাজ্জাদুল করিম এই সংকটের কথা জানিয়েছেন। পোস্টে বলা হয়েছে, দেশে কোটি কোটি মোটরসাইকেল ব্যবহারকারী রয়েছে। তাঁরা তেল কিনতে পাম্পে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকছেন। দাড়িয়ে থেকে তাঁরা ক্লান্ত বোধ করছেন। বিরক্ত বোধ করছেন। তিক্ত হয়ে পড়ছেন। পাম্পের কর্মীদের কার্যত নাভিশ্বাস উঠছে। সৈয়দ করিম জানিয়েছেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে নির্ধারিত সীমার মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে তা বর্তমান চাহিদার তুলনায় কম। ফলে কোথাও পাম্প তেল পাচ্ছে না। আবার কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় কম পাচ্ছে। বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মূখে পড়ছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক পাম্পে ভিড় দেখলেই অন্যরা তেল নিতে সেখানে হাজির হচ্ছেন।












Discussion about this post