আমেরিকা সেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়ার জন্য লাগাতার হুমকি দিয়ে চলেছে। তেহরান ওয়াশিংটনের কোনও হমকিকে পাত্তা দিতে চাইছে না। এই অবস্থায় বিশ্বজুড়ে তৈরি হয়েছে জ্বালানি সংকট। কম বেশি সব দেশেই এর প্রভাব পড়েছে। সবাই সংকট থেকে বাঁচার জন্য পথ খুঁজতে শুরু করেছে। হাত গুটিয়ে নেই ভারত। তারা রাশিয়ার থেকে তেল কিনতে চাইছে। তবে আমেরিকার অনুমতি সাপেক্ষে। প্রশ্ন উঠতে পারে, মস্কোর তেল কেনার জন্য দিল্লির কেন ওয়াশিংটনের অনুমতি নিতে হচ্ছে? দিল্লির সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তো রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বরাজনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এই অবস্থায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে নতুন করে কূটনৈতিক তরজায় জড়িয়ে না যাওয়াই সাউথব্লকের লক্ষ্য। বিশ্বজুড়ে এক রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এই অস্থিরতার দ্রুত অবসান হবে বলে মনে করছেন না বিশ্লেষকেরা। এই অবস্থায় ফর্মুলা একটাই আপনি বাঁচলে বাপের নাম। সাউথব্লক এখন সেই রাস্তা নিয়েছে। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারতকে ৩০ দিনের অস্থায়ী ছাড় দিয়েছে আমেরিকা। ট্রাম্প সরকারের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-য়ে এই নিয়ে একটি পোস্ট করেন। সিদ্ধান্তের কারণ জানাতে গিয়ে তিনি লেখেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেল সরবরাহ বজায় রাখতেই এই সিদ্ধান্ত।
রাশিয়া থেকে ভারতের অশোধিত তেল কেনা নিয়ে আমেরিকার আপত্তি নতুন নয়। ট্রাম্প ভারতের ওপর শাস্তিমূলক পদক্ষেপ হিসেবে ২৫ % বাণিজ্যশুল্ক আরোপ করেন। সব মিলিয়ে শুল্কের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫০ শতাংশ। সাউথব্লক থেকে সেই সময় সাফ জানিয়ে দেওয়া হয় দেশের স্বার্থ মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আগামীদিনে এই বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সাউথব্লকের এই কড়া অবস্থানে সুর নরম করে ওয়াশিংটন। তারপর শুরু হয় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যশুল্ক নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এই অবস্থায় সাউথব্লক নতুন করে আর ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংঘাতে যেতে চাইছে না। ঠাণ্ডা মাথায় কাজ হাসিল করতে চাইছে।
ভারতের দেখাদেখি এখন বাংলাদেশও রুশ তেল কিনতে চাইছে। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, সেই সঙ্গে জাতীয় অর্থনীতিকে সমর্থন দিতে ভারতের মতো বাংলাদেশকেও তেল কেনার বিষয়ে ছাড়পত্র দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। অর্থ- পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার সময় বিষয়টি তিনি উত্থাপন করেন। বৈঠকে জ্বালানি সহযোগিতা, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যসহ আরও নানা বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
পরে সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রী বলেন, ‘ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ইন্ডিয়াকে ওয়েভার দিয়েছে। টেম্পারার ওয়েভার দিয়েছে রাশিয়া। তারা রাশিয়ার তেল কিনতে পারবে। আমরাও চাইছি বাংলাদেশ .. বাংলাদেশকেও দাও। why not Bangladesh? বাংলাদেশকে ওয়েভার দাও। আমরাও বিগ সাপোর্টার। বলছে.. ওয়াশিংটন পাঠাবে। দেখা যাক কী হয়। ’
এবার আসা যাক কেন যুক্তরাষ্ট্রের অনুমতি চাইছে বাংলাদেশ? সোজা উত্তর ভয়ে। কী সেই ভয়? মার্কিন প্রশাসনের অনুমতি ছাড়া রাশিয়ার থেকে তেল কিনলে আমেরিকা সেই দেশের ওপর সেকেন্ড স্যাংশন বা দ্বিতীয় পর্যায়ের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে। সুইফট থেকে (SWIFT) রাশিয়ার ব্যাংকগুলো বিচ্ছিন্ন থাকায় বিশেষ অনুমতি ছাড়া ডলার বা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা অসম্ভব। অনুমতি না থাকলে বাংলাদেশের স্থানীয় ব্যাংকগুলি মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ভয়ে এই লেনদেনে যুক্ত হতে চাইবে না। এছাড়া আন্তর্জাতিক সমুদ্রসীমায় রুশ তেলবাহী জাহাজ চলাচলের জন্য পশ্চিমা কোম্পানিগুলোর বিমা ও কারিগরি সহায়তা প্রয়োজন হয়। ওয়েভার না থাকলে এসব সেবা পাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে, যা আমদানির পথ রুদ্ধ করে দেয়। এছাড়াও রয়েছে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের অবনতি হওয়ার একটা আশংকা।
ফিলিং স্টেশনগুলোয় জ্বালানি তেলের জন্য যানবাহনের দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। তেলের পাম্পে তেল না থাকার নোটিস ঝুলছে। গাড়িচালকরা জ্বালানির আশায় ঘুরছেন এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে। জানিয়েছেন তাদের ভোগান্তির কথা। পাম্পমালিকরা বলছেন, ঈদের ছুটিতে দু’দিন ডিপো থেকে সরবরাহ বন্ধ থাকায় এই সাময়িক সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিকেল নাগাদ পাম্পে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশা প্রকাশ করেছেন তারা।












Discussion about this post