বাংলার প্রত্যন্ত এক নিবিড় গ্রাম টুঙ্গিপাড়া। সেখানেই বেড়ে উঠেছেন বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা এবং তাঁর দুই কন্যা। যিনি বাঙালির মুক্তি সংগ্রামের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজুবর রহমানের ছায়াসঙ্গী। এই দম্পতির দুই মেয়ে শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। যিনি আজীবন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও উন্নতির জন্য কাজ করে গেলেন, তবুও বিশ্বাসঘাতক ও ক্ষমতালোভী কিছু মানুষের বুলেটে ঝাঁঝরা হলেন সপরিবার। ভাগ্যের জোরে বেঁচে গিয়েছিলেন দুই বোন। তাঁদেরই একজন পরবর্তী সময় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে ফিরে এসেছিলেন কার্যত আগুন পাখির মতোই।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই ভয়াবহ নারকীয় ঘটনার পর কীভাবে তিনি বেঁচে গিয়েছিলেন দুই বোন, কেমন ছিল তাঁদের জীবনের যুদ্ধ সেই ইতিহাস অনেকের কাছেই অজানা। “অন্ধকারের সিন্ধুতীরে একলাটি ওই মেয়ে, আলোর নৌকা ভাসিয়ে দিল আকাশপানে চেয়ে।” শেখ হাসিনার জীবনকাহিনীর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা কবিতার এই দুই লাইন একাত্ম হয়ে রয়েছে। ধ্বংসস্তুপ থেকে উঠে এসে তিনি তাঁর জীবনকে উৎসর্গ করেছেন এই বাংলার আপামর মানুষের কল্যাণে। এখনও তিনি কার্যত ধ্বংসস্তুপের অতলে তলিয়ে গিয়েছেন। গত বছরের ৫ আগস্ট তাঁকে কার্যত এক কাপড়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। আগের বারের মতোই ভারতবর্ষ বঙ্গবন্ধুর কন্যাকে আপন করে আশ্রয় দিয়েছে ভারত। ফারাক একটাই তখন ছিল কংগ্রেসের জমানা, এখন বিজেপির। কিন্তু শেখ হাসিনা এবং ভারতবর্ষের মধ্যে আত্মিক সম্পর্কে কোনও ভাটা পড়েনি। ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ সাল, দীর্ঘ ৬ বছর হাসিনা ভারতের আশ্রয়ে ছিলেন। যদিও নিরাপত্তার কারণে সে সময় তাঁর নাম-পরিচয় পাল্টে ফেলা হয়েছিল ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধির নির্দেশে। তবে ১৯৮১ সালের ১৭ মে তিনি স্বদেশে ফিরেছিলেন স্বনামে-স্বপরিচয়ে ফিরেছিলেন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। স্বামী বিশিষ্ট পরমানু বিজ্ঞানী, ফলে বাকি জীবনটা তিনি আয়েশ করেই কাটাতে পারতেন। তবুও যার শরীরে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতার রক্ত বইছে, তিনি যে অনিশ্চিয়তার জীবনই বেছে নেবেন এটা অস্বাভাবিক নয়।
কিছু কিছু প্রত্যাবর্তন ইতিহাসে লেখা থাকে। কারো কারো ফিরে আসা মহাকালের নিয়মে ঘটে। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দিনটিও ছিল সেরকম। প্রায় ছয় বছর নির্বাসন শেষে জননেত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখেন। সেবার তাঁর প্রত্যাবর্তনের দিনক্ষণ আগে থেকেই ঘোষণা করা হয়েছিল। ফলে বিমানবন্দরে কাতারে কাতারে মানুষ এসেছিলেন তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে। এবারও দেশছাড়া হয়েছেন শেখ হাসিনা, এক সাজানো গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে। এবারও তিনি ভারতের আশ্রয়ে রয়েছেন। এবারও তাঁর দেশে ফেরা নিয়ে নানান জল্পনা-কল্পনা চলছে। কয়েকটি মহল থেকে দাবি করা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ নেত্রী আগামী ৭ ডিসেম্বর দেশে ফিরবেন। অর্থাৎ ঠিক জাতীয় নির্বাচনের আগে। এটা কখন-কীভাবে সম্ভব তা অবশ্য কালের গর্ভে লুকিয়ে আছে। তবে শেখ হাসিনা যে একদিন দেশে ফিরবেন এবং তা স্বমহিমায়, সেটা নিয়ে অনেকেই সন্দেহের অবকাশ রাখছেন না। কারণ, তিনি আগুন পাখি, কোনও কিছুই তাঁকে পোড়াতে পারে না।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে দীর্ঘ ১৫ মাস তিনি দেশের বাইরে। তবুও তাঁর উপস্থিতি গোটা বাংলাদেশে আগের মতোই বিদ্যমান। এখনও তাঁরা ছায়া দেখে কেঁপে ওঠেন মুহাম্মদ ইউনূস-সহ ষড়যন্ত্রকারীরা। হাসিনা ও তাঁর দলের নেতাদের বাংলাদেশ থেকে দূরে রাখতে নানান কর্মকাণ্ড করে চলেছে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। তবুও আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে আটকানো যাচ্ছে না যেন। তিনি ভারতে বসেই বাংলাদেশে তাঁর দলের সংগঠন প্রায় নতুন করে সাজিয়ে ফেলেছেন। প্রতিদিনই তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তের দলীয় কর্মী এবং নির্যাতিত মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন। একদিকে যেমন তিনি দলীয় কর্মীদের সংগঠিত করছেন, অন্যদিকে সোশ্যাল মিডিয়ার নানা প্ল্যাটফর্ম থেকে জাতির উদ্দেশ্যে বক্তব্য রেখে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও তাঁর সরকারের নানা দুর্নীতির পর্দাফাঁস করছেন। তার ফলে দিন দিন আওয়ামী লীগের মিছিলে বাড়ছে লোকসংখ্যা। দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে আওয়ামী লীগের মিছিল। তাঁর দল এখনও রাজনৈতিকভাবে নিষিদ্ধ, দলের নিবন্ধনও কেঁড়ে নেওয়া হয়েছে। তবুও লক্ষ্যে অবিচল শেখ হাসিনা। তিনি বাংলাদেশে না থেকেও আছেন, আবারও একবার ফিনিক্স পাখির মতো আগুনের গোলার মতো ফিরে আসবেন বাংলাদেশে। সেই দিনটা ৭ ডিসেম্বর, ২০২৫ হলেও হতে পারে।












Discussion about this post