সরকারে আসীন একটি দলের অস্তিত্ব অনেকটাই নির্ভর করে বিরোধীদলের ওপর। প্রশ্নটা হচ্ছে কীভাবে? নির্ভরতা শুধুমাত্র একটি দিক থেকে নয়, একাধিক দিক থেকে তারা জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল। এই প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উল্লেখ করতে হয়। ১৫ ফেব্রুয়ারি, রবিবার। সেদিন জামায়াত নেতা শফিকুর রহমানের বসুন্ধরায় গিয়েছিলে তারেক রহমান। ঠিক তাঁর তিনদিন আগে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। তারেক বসুন্ধরায় পৌঁছলে তাঁকে ফুল দিয়ে বরণ করেন শফিকুর রহমান সহ জামায়াতের অন্য নেতারা। এই সাক্ষাৎকার জন্ম দিয়েছিল বিতর্কের। বৈঠকের পর জামায়াতে আমির নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি ছবি পোস্ট করেন। ছবির ক্যাপশানে তিনি তারেক রহমানকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী বলে সম্বোধন করেন। বৈঠকে ছিলেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফকরুল ইসলাম আলামগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। জামায়াতে নেতাদের মধ্যে ছিলেন দলের নায়েবে আমির, সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাদের ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। ফেসবুকে জামায়াতে আমির লেখেন, “ তিনি আজ আমার আবাসিক কার্যালয়ে এসেছিলেন। তাঁর এই আগমন আমাদের জাতীয় রাজনীতির জন্য এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। আমি তাঁর এই আগমনকে স্বাগত জানাই। প্রত্যাশা করি, সংলাপ ও দায়িত্বশীলতার মধ্যে দিয়ে এটি রাজনৈতিক পরিপক্কতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার এক নতুন অধ্যায় সূচনা করবে। ”
জামায়াতে আমির আরও লেখেন, “আমাদের আলোচনায় তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে নির্বাচন পরবর্তী হিংসাত্মক ঘটনা এবং বিরোধীদলের কর্মী ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে কোনও হামলা রোধে তিনি কার্যকর পদক্ষেপ করবেন। আমি এই আশ্বাসকে সাধুবাদ জানাই। ”জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে নির্বাচিত সরকারকে পূর্ণ সহযোগিতা করবেন জানিয়ে, জামায়াতের আমির ফেসবুক পেজে লেখেন, “আমরা আদর্শ একটি বিরোধীদল হিসেবে আমাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে অঙ্গীকারবদ্ধ। সরকারের জনকল্যাণমূলক কাজে আমাদের অবশ্যই সমর্থন থাকবে। কিন্তু যেখানে সরকারের থেকে জবাবদিহির প্রয়োজন, সেখানে আমরা সরকারের থেকে অবশ্যই জবাব আদায় করব।” সেই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, “আমাদের উদ্দেশ্য সংঘাত নয়, সংশোধন। বাধা দেওয়া নয়, পর্যবেক্ষণ। দেশের মানুষ এমন একটি সংবাদ প্রত্যাশা করে, যা ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার রক্ষা করবে। এবং স্থিতিশীলতার সঙ্গে রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ”
প্রথমে আসা যাক বিরোধী দল হিসেবে তাদের দায়িত্ব পালনের প্রসঙ্গ। সংসদ অধিবেশনের প্রথম দিন বাংলাদেশ তো বটেই কার্যত গোটা দুনিয়া দেখেছে, তারা কী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ভাষণের প্রতিবাদ করা থেকে শুরু করে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময় তাদের আসনে বসে থাকা – জামায়াত সম্পর্কে জনমনে ভালো ধারণা তৈরি হয়নি। তারপরেও কেন বলা হচ্ছে, বিএনপি জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল? রাজনীতিতে সরকারে আসীন একটি দলের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে রয়েছে জামায়াত। কারণ, তারা শুধু প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি, সরকারের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সংসদে তারা যত সরকারের বিরুদ্ধে সরব হব, সরকারের পায়ের তলার মাটি ততই শক্ত হবে। এটা শুধু বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রেই নয়, সব দেশের জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের ওপর নির্ভর করেই বেঁচে থাকে সরকারে আসীন একটি দল। কোনও কোনও মহল থেকে বলা হচ্ছে, সরকারে যে দল আসীন হয়েছ এবং প্রধান বিরোধীদল হিসেবে যে দলটির আত্মপ্রকাশ ঘটেছে, তাদের উভয়ের শত্রু কিন্তু একজন – আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ কিন্তু স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ব্যাপারে মনস্থির করে ফেলেছে। এই অবস্থায় সরাসরি না হলেও পরোক্ষভাবে দলটি জামায়াতের ওপর ভীষণভাবে নির্ভরশীল। অঙ্ক সে কথাই বলছে।












Discussion about this post