২২ বর্গকিলোমিটারের একটি ভূখণ্ড, যা বাংলাদেশের অন্তর্গত হলেও পুরোপুরি ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। আমরা ছিটমহল সম্পর্কে জানি, যা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত বরাবর এমন অবস্থানে ছিল যেখানে বসবাসকারীরা ঠিক কোনও দেশেরই নাগরিক ছিলেন না। ভৌগোলিক অবস্থানগত জটিলতায় তাঁরা এক দেশের নাগরিক হলেও, থাকতে হতো অন্য দেশের অধীনে। ফলে দীর্ঘ কয়েক বছর তাঁরা সমস্ত নাগরিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলেন। ২০১৫ সালের ১ আগস্টের পূর্বে ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের আর বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের এমন ১৬২টি ছিটমহল ছিল। ১৯৭৪ সালে ভারত ও বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীরা এমন ছিটমহল বিনিময়ের একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। কিন্তু নানা কারণে তা বাস্তবায়িত হয়নি। এরপর ২০১৫ সালের ৭ মে, ভারতের সংসদ ১০০তম সংশোধনী পাস করার পর দুই দেশ এই চুক্তির একটি সংশোধিত সংস্করণ গ্রহণ করে। এবং ওই বছরের ৬ জুন ভারতের মূল ভূখণ্ডে অবস্থিত ৫১টি বাংলাদেশী ছিটমহল ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। একইভাবে বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ডে ১১১টি ভারতীয় ছিটমহল বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই সময়, ছিটমহলের বাসিন্দাদের নিজেদের দেশে চলে যাওয়ার সুবিধাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এত কিছুর পরও, একটি ছিটমহল নিয়ে বিতর্ক থেকে যায়, যা আজও রয়ে গেছে। সেটি হল ভারতের মূল ভুখন্ডে, পুরোপুরি ভারতের ভূমি দ্বারা বেষ্টিত দহগ্রাম ইউনিয়ন, যা বাংলাদেশের অন্তর্গত। ২২ বর্গকিলোমিটারের এই ভূখণ্ডে প্রায় হাজার বিশেক বাংলাদেশি নাগরিকের বসবাস। ভারতে অভ্যন্তরে তিন বিঘা করিডোর ব্যবহার করে এখানে প্রবেশ ও বের হতে হয়। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সাম্প্রতিক টানাপোড়েনের জেরে এই এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা নিয়ে বেড়েছে উত্তেজনা। বলা ভালো, কাঁটাতারের বেড়া দেয়াকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের যেসব স্থানে উত্তেজনা দেখা গেছে তার অন্যতম লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রাম ইউনিয়ন।
দহগ্রামে সীমান্তের শূন্যরেখার পিলারের কাছ দিয়ে চারফুট উচ্চতায় লোহার অ্যাঙ্গেল বসিয়ে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে বিএসএফ। সেই বেড়ায় কাঁটাতারের সঙ্গে নির্দিষ্ট দূরত্বে কাচের বোতল বেঁধে দিয়েছে বিএসএফ। পাশাপাশি দিন-রাত সশস্ত্র অবস্থায় টহল দিচ্ছেন বিএসএফ জওয়ানরা। যা নিয়ে দহগ্রামের বাসিন্দাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক। দহগ্রামের বাসিন্দাদের দাবি, গত বছরের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু যখন থেকে বাংলাদেশে পালাবদল হল, তবে থেকেই পরিস্থিতি পাল্টে গেল। সীমান্তে বিএসএফের তোড়জোড় বেড়ে যায়। দহগ্রাম ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যানের দাবি, ২০১০ সালে ভারত-বাংলাদেশ চুক্তি অনুযায়ী দহগ্রামে শূন্যরেখা বরাবর বেড়া দেওয়ার অনুমোদন পেয়েছিল ভারত। কিন্তু এতদিন সেই কাঁটাতারের বেড়া না দিলেও গত ৫ অগাস্টের পর এই বেড়া দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। দাবি, সীমানা বেড়ার কাছাকাছি কৃষি কাজ, ক্ষেত খামারে কাজ করতে গিয়ে সমস্যা এবং বাধার মধ্যে পড়তে হচ্ছে দহগ্রামের বাসিন্দাদের।
অপরদিকে বিএসএফ দাবি করছে, ৫ আগষ্টের পর থেকে বাংলাদেশ থেকে লাগাতার উস্কানি আসছে। বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবি প্রতি পদে বাঁধা দিচ্ছে। এমনকি অরক্ষিত সীমান্তে মাদক ও মানব পাচার, চোরাচালান বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে বাড়তি সতর্কতা নিতে হচ্ছে বিএসএফ-কে। কেন্দ্রীয় সরকারও চাইছে দ্রুত অরক্ষিত সীমান্তে বেড়া দিতে। যদিও দাবি, ২০১১ সাল থেকে তিন বিঘা করিডোর ২৪ ঘণ্টা খোলা থাকে। অতীতে বড় বাস ও ট্রাক চলাচল করতো। কিন্তু গত ৫ আগষ্টের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টেছে। এখন স্থানীয় ব্যবসায়ী এবং কৃষকরা জানাচ্ছেন, তাদের কৃষিপণ্য বা মালামাল পরিবহনে বাড়তি খরচ বহন করতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিএসএফ নজরদারি পোস্টে তীব্র আলোর ব্যবস্থা করেছে ও বহু ক্যামেরা বসিয়েছে। যার ফলে তাঁদের গোপনীয়তা ক্ষুন্ন হচ্ছে। যদিও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, “একটা জিনিস খেয়াল রাখতে হবে তিনবিঘা করিডোরের ভিতরে যে দহগ্রাম আঙ্গরপোতা ওইটা হলো ভারতের পেটের ভিতরে। চারিদিকে ওরা, আমরা মাঝখানে। তো এইগুলি একটু আমাদের ট্যাক্টফুলি ইয়ে করতে হয়। অপরদিকে দহগ্রামের বাসিন্দারা মনে করছেন, এতদিন হাসিনার আমলে তাঁদের কোনও সমস্যা হয়নি, কিন্তু ইউনূসের তদারকি সরকার আসার পরই যত সমস্যা তৈরি হয়েছে। তাঁরা আশা করছেন, দ্রুত এই সমস্যা মিটবে।











Discussion about this post