কারখানায় পণ্য উৎপাদনে বলপূর্বক শ্রমের ব্যবহার বন্ধে বাংলাদেশসহ ৬০ দেশ যথেষ্ট পদক্ষেপ করেছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে আমেরিকা। গত বৃহস্পতিবার সে দেশের বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের (ইউএসটিআর) এক বিজ্ঞপ্তিতে বিষয়টি জানানো হয়। এর আগে গত বুধবার উৎপাদন খাতে অতিরিক্ত সক্ষমতা ও অতিরিক্ত উৎপাদন করা হচ্ছে কিনা, তা খতিয়ে দেখতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ১৬টি দেশ নিয়ে তদন্তের কথা জানায় আমেরিকা।
ইউএসটিআরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আমেরিকার ১৯৭৪ সালের বাণিজ্য আইনের ৩০১(বি) ধারা অনুযায়ী নতুন এ তদন্ত করা হবে। পণ্য উৎপাদনে বলপূর্বক শ্রমের ব্যবহার থাকলে সেই পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর আইন, নীতি ও বাস্তব প্রয়োগ কতটা যুক্তিযুক্ত বা বৈষম্যমূলক তা খতিয়ে দেখা হবে। এ ছাড়া এসব নীতি বা অনুশীলন আমেরিকার বাণিজ্যের ওপর কোনো ধরনের বোঝা বা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে কিনা যাচাই করা হবে। কয়েক সপ্তাহ আগে মার্কিন সুপ্রিমকোর্ট এক রায়ে জানায়, গত এপ্রিলে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর ট্রাম্প যে শুল্ক আরোপ করেছিলেন, তা অবৈধ। এ রায়ের পরপরই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নতুন করে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা করেন। তিনি আদালতের ওই রায়কে ‘ভয়াবহ’ বলে মন্তব্য করেন এবং তার বাণিজ্যনীতি বাতিল করা বিচারকদের ‘মূর্খ’ বলে সমালোচনা করেন। উচ্চ আদালত তখন রায় দেয়, আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইন প্রেসিডেন্টকে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা দেয় না। রায়ে বলা হয়েছে জাতীয় জরুরি অবস্থার জন্য সংরক্ষিত আইনকে ব্যবহার করে শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্প তার কর্তৃত্বের সীমা লঙ্ঘন করেছেন।
মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার বলেন, বলপূর্বক শ্রমের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ঐকমত্য রয়েছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন দেশ তাদের বাজারে বলপূর্বক শ্রমের মাধ্যমে উৎপাদিত পণ্যের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সেগুলো কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন দেশের সরকার বলপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করতে যথেষ্ট পদক্ষেপ নিয়েছে কিনা এবং এসব অনৈতিক চর্চা মার্কিন শ্রমিক ও ব্যবসার ওপর কতটা প্রভাব ফেলছে তা এই তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। সাধারণত কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের ‘অন্যায্য বাণিজ্য আচরণ’ মোকাবিলায় ওয়াশিংটন এই কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিয়ে থাকে। গত মাসে আমেরিকার সুপ্রিমকোর্ট মার্কিন প্রেসিডেন্টের শুল্কনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাতিল করার পর সরকারের পক্ষ থেকে এ পদক্ষেপ নেওয়া হলো।
তদন্তের আওতায় থাকা দেশগুলো হচ্ছে– বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, অ্যাঙ্গোলা, আর্জেন্টিনা, অস্ট্রেলিয়া, বাহামা, বাহরাইন, ব্রাজিল, কম্বোডিয়া, কানাডা, চিলি, চীন, কলম্বিয়া, কোস্টারিকা, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র, ইকুয়েডর, মিসর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, গায়ানা, হন্ডুরাস, হংকং, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইসরায়েল, জাপান, জর্ডান, কাজাখস্তান, কুয়েত, লিবিয়া, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, মরক্কো, নিউজিল্যান্ড, নিকারাগুয়া, নাইজেরিয়া, নরওয়ে, ওমান, পেরু, ফিলিপাইন, কাতার, রাশিয়া, সৌদি আরব, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া, সুইজারল্যান্ড, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ত্রিনিদাদ ও টোবাগো, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা। এ ছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর বিষয়েও এই তদন্ত হবে।
এ বিষয়ে বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, ইউএসটিআরের বিবৃতিতে মনে হচ্ছে, আমেরিকা তাদের স্থানীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে নতুন উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে। যেমনটা তারা বিভিন্ন দেশের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে পারস্পারিক শুল্ক আরোপ করেছিল। যে ১৬টি দেশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব দেশে পণ্য উৎপাদনে অন্যায্য চর্চা, শ্রম অধিকার লঙ্ঘন, অতিরিক্ত রপ্তানিতে প্রণোদনা এবং মেধাস্বত্বের লঙ্ঘনের কোনো ঘটনা ঘটছে কি-না, সেসব খতিয়ে দেখতে তারা শুনানি করবে। অভিযোগের প্রমাণ পেলে হয়তো তারা বাড়তি শুল্ক বসাতে পারে। এই তদন্ত প্রক্রিয়ায় অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের নাম আসাটা অস্বস্তিকর। তবে এতে খুব চিন্তিত হওয়ার কিছুই নেই। কারণ, বাংলাদেশে পণ্য উৎপাদনে মেধাস্বত্বের চর্চা এখনও সীমিত এবং বাংলাদেশ যে ধরনের পণ্য (তৈরি পোশাক) উৎপাদন করে তা আমেরিকা উৎপাদন করে না। তিনি আরও বলেন, তদন্তের বিষয়টি যেহেতু সামনে এসেছে, সেহেতু বাণিজ্য মন্ত্রণকে এ ব্যাপারে এখনই উদ্যোগ নিতে হবে।












Discussion about this post