মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিকমহল দ্বিধাবিভক্ত। একটি পক্ষ বলছে, ইরানের পরাজয় অবসম্ভাবি। অপর পক্ষ সেই বিষয়ে যে একেবারেই সহমত পোষণ করছে না, তা নয়। তবে তারা বলছেন, ইরান এতো সহজে আমেরিকাকে ময়দান ছেড়ে দেবে না। তার একটা দৃষ্টান্ত তারা ইতিমধ্যে তৈরি করেছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দিয়েছে। এবার তেহরান নতুন একটি কৌশল নিয়েছে। সেই কৌশল হল সরাসরি মার্কিন অর্থনীতির মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দেওয়া। তবে হাতুড়ির ঘা দিয়ে নয়, ধীরে ধীরে। ইংরেজিতে যাকে বলা যায় slow poisoning. কীভাবে তারা এটা করছে, এই প্রতিবেদন তা নিয়ে। বলা হচ্ছে, ইরানের এই কৌশল শুধুমাত্র আমেরিকার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না, বিশ্ব অর্থনীতির হৃদয়ে আঘাত করেছে।
আমেরিকার আসল শক্তির উৎস ডলার। গোটা বিশ্বের বিনিময় মাধ্যম এই ডলার। তাই, বিশ্বের সব কটি দেশ তাদের রিজার্ভে ডলার রাখে। দশকের পর দশক ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল এই ডলার। পৃথিবীতে তেল বিক্রি বা কেনা হয় ডলারে। তার একটা বড়ো অংশ আবার ফিরে আসত আমেরিকার অর্থনীতিতে। অনেকে কিনতেন বন্ড। অনেকে আবার বিনিয়োগ করতেন। প্রক্রিয়ার নাম হয়ে ওঠে পেট্রো-ডলার ব্যবস্থা। এটা শুরু হয়েছিল সাতের দশকে। সেই সময় বিশ্ব অর্থনীতি এক বড়ো পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। ১৯৭১ সালে যুক্তরাষ্ট্র ডলারকে সোনায় বদল করার নিয়ম বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর ১৯৭৪ সালে তারা সৌদির সঙ্গে একটি বড়ো সমঝোতা করে। সমঝোতা অনুযায়ী, দেশটি তেল বিক্রি করবে ডলারে। আর সেই টাকা তারা আবার যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিনিয়োগ করবে। এই ব্যবস্থা বেশ কয়েক বছর ধরে চলে। ধীরে ধীরে ডলার সেই সময় থেকে শক্তিশালী হতে শুরু করে। এই চুক্তি বিশ্ব অর্থনীতির কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন আনে। কারণ পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ পণ্য হল এই তরল সোনা। বিশ্বে এমন কোনও দেশ নেই যারা এই তরল সোনা ব্যবহার করে না। ফলে, যে সব দেশকে তেল কিনতে হত, তাদের আগে ডলারের ব্যবস্থা করতে হতো। পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে ডলারের শক্তি। গোটা দুনিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে ডলার। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসেব অনুযায়ী, ৫৮ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ডলারে রাখা হয়। ইরান কিন্তু সেই ব্যবস্থাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে।
যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তেহরান বুঝে গিয়েছিল, ওয়াংশিংটনকে শুধুমাত্র ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে জবাব দিলে হবে না এমন কিছু করতে হবে, যাতে দেশটির অর্থনীতির প্রাণ ভোমরাকে খতম করা। প্রথম তারা ধাক্কা দিয়েছে হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে। পারস্য উপসাগরকে আরব সাগরের সঙ্গে যোগ করেছে ৩৪ কিলোমিটার সরু জলপথ। সরু পথ দিয়ে পৃথিবীর প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহন হয়। প্রতিদিন প্রায় ২০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে যায়। ইরান এই হরমুজ প্রণালী ব্যবহার নিয়ে নতুন শর্ত চাপিয়ে দিয়েছে। সেই শর্ত হল যে সব তেলবাহী জাহাজ চিনা মুদ্রা ইউয়ানে লেনদেন করবে, তাদের এই প্রণালী দিয়ে যেতে দেওয়া হবে। কিন্তু ইরান এই কেন এই শর্ত চাপালো। উদ্দেশ্যে ডলার আধিপত্যবাদকে খর্ব করা। তেল একটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্য। মাসের পর মাস তেল আমদানি বন্ধ থাকলে যে কোনও দেশের অর্থবাজার অস্থির হয়ে উঠবে। কোনও দেশ সেটা চাইবে না। তারা যদি তেল ক্রয় বিক্রয়ে ইউয়ান ব্যবহার করতে শুরু করে তাহলে তেলের বাজারে ডলারের নিয়ন্ত্রণ দূর্বল হবে। রাশিয়াও কিন্তু একসময় তেল বিক্রি করত রুবলে। অপরদিকে চিন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের মুদ্রাকে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে। তেহরানের শর্ত মেনে দেশগুলি যদি চিনের মুদ্রায় লেনদেন শুরু করে, তাহলে ইউয়ান আন্তর্জাতিক বাজারে স্বীকৃতি পাবে। দূর্বল হবে ডলার।












Discussion about this post