সংবাদ শিরোনাম মনে করায় ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ছবির এই দৃশ্যের কথা।
সিংহাসনে বসে রয়েছেন ধর্মরাজ। তার সামনে হাজির সিধু। ধর্মরাজের আদালতে পাপ পূণ্যের হিসেব চলছে। সেই হিসেব করতে গিয়ে ধর্মরাজ সব কিছু গুলিয়ে ফেলেছেন। একসময় তাঁকে আক্ষেপ করে বলতে হল – ‘তাই তো, বিচারপদ্ধতির মধ্যে কোথায় যেন একটা গলদ রয়েছে।’ তাঁর সেই আক্ষেপ শুনে সিধুর পাল্টা জবাব – ‘থাকবে না! সেই আদ্যিকাল থেকে একই নিয়মে বিচার চালাচ্ছেন। যত সব পচা আইন দিয়ে গোঁজামিলে কাজ সারছেন।’
বাংলাদেশে বিচারের নামে যা চলছে তার সঙ্গে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ ছবির মিল বেশি। সে দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে তাঁর ধানমণ্ডির বাড়ি থেকে পুলিশ গ্রেফতার করে। বাংলাদেশ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার যুগ্ম কমিশনার নাসিরুল ইসলাম এই গ্রেফতারের খবর দিতে গিয়ে বলেন, সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন বিচারপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে গত বছর জুলাই আন্দোলনের সময় যুবদলের কর্মী আব্দুল কাইয়ুম আহাতকে খুন করার। সব দেশেই আইন রয়েছে অভিযুক্তেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার রয়েছে। কিন্তু খায়রুল হককে আদালতে তোলা হলে তাঁর তরফে কোনও আইনজীবী ছিলেন না। তাঁকে হাসিনার ক্রীতদাস আখ্যা দিয়ে জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম ঢাকা বার ইউনিটের আহ্বায়ক খোরশেদ আলম বলেন, ‘হাসিনার নির্দেশে বিচারবিভাগকে ধ্বংস করেছেন। সেই অবিচারের ফলে তিনি আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন। হাসিনার বিরুদ্ধে যত মামলা তাঁকেও ততগুলি মামলায় অভিযুক্ত করা হবে, এটাই আশা। ’ প্রায় একই সুরে গান গেয়েছেন বিএনপির আইন বিষয়ক সম্পাদক তথা ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, ‘প্রাক্তন প্রধান বিচারপতি খায়রুল হক এ দেশে গণতন্ত্রকে হত্যা করেছেন। শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বানিয়েছেন। খায়রুল হকের এমন শাস্তি হওয়া উচিত যাতে অদূর ভবিষ্যতে নতুন কোনও খায়রুল হকের জন্ম না হয়। ’
কোনও ব্যক্তি আইনবিরুদ্ধ কাজ করলে প্রশাসন বা আদালত তাঁকে গ্রেফতারের নির্দেশ দিতে পারে। অভিযোগের স্বপক্ষে দিতে হয় চার্জশিট। কিন্তু বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে দায়ের করা অভিযোগপত্রে তার ভূমিকার কোনও ব্যাখ্যা নেই। তদন্তে প্রত্যক্ষদর্শীর কোনও বয়ান নেই।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীমহল এই গ্রেফতারের কড়া নিন্দা করেছেন। তাঁদের মতে, এটি একজন ব্যক্তির প্রতি অন্যায় নয়। এই গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে তদারকি সরকার সরাসরি বিচার ব্যবস্থার মর্যাদার ওপরেই আঘাত করল। বিচার ব্যবস্থাকে অসম্মান করল। বিচারের নামে বাংলাদেশে শুধু প্রহসন চলছে না, চলছে প্রতিশোধস্পৃহার এক নির্লজ্জ খেলা। যে খেলায় সামিল তদারকি সরকার প্রধান থেকে শুরু করে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। এ এক এমন ট্রাইব্যুনাল, যাকে ফ্রেমে বাঁধিয়ে রাখতে হয়। আদালতের বিচারক যিনি, তিনিই চিফ প্রসিকিউটর, তিনিই আবার বিবাদী পক্ষের আইনজীবী।
হাসিনা সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য এই আদালতকে কড়া ভাষায় কটাক্ষ করেন। তাঁর মতে, এটা আসলে একটা ক্যাঙারু কোর্ট। আর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের প্রাক্তন প্রধান বিচারপতির সঙ্গে যা করা হল, সেটা লজ্জাস্কর বললেও কম বলা হবে। এই আদালত তৈরি হয়েছিল হাসিনার আমলে। তার একটা উদ্দেশ্য ছিল। আর হাসিনা-উত্তর পর্যায়ে সেই আদালত হয়ে উঠেছে প্রতিশোধের এক অবাধ বিচরণভূমি। বিচারবিভাগের স্বাধীনতা যেখানে নষ্ট হয়ে যায় সেখানে ন্যায়বিচার থাকে শুধু সাদা কাগজে।












Discussion about this post