কিছু তথ্য প্রমাণ ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের মাধ্যমে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের নানা অজানা তথ্য উঠে এসেছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টে। ওই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে মানবতাবিরোধী অপরাধে ক্ষমতাচূত আওয়ামী লীগ, কিভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করেছে তার চিত্রও। কিন্তু তবুও গত বছর আগস্টে বাংলাদেশের উৎখাত হওয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে রয়েছে অনেক কিন্তু ও যদি, রয়েছে অনেক সন্দেহ। যার ফলে ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তা নিয়ে উঠছে বহু প্রশ্ন। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, এই বিচার কি আন্তর্জাতিক মান্যতা পাবে?
আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সে সম্ভাবনা কম। জাতি সংঘ রাজি আছে তাঁদের হাতে থাকা তথ্য প্রমান বাংলাদেশ সরকারের কাছে তুলে দিতে, কিন্তু তার জন্য কয়েকটি শর্ত মানতে হবে ইউনূসের সরকারকে। কিন্তু এটা মেনে নিতে চাইলেও ইউনূস সরকার এই মুহূর্তে ব্যাকফুটে। কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিচার যেভাবে দ্রুততার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, তা আন্তর্জাতিক মঞ্চ কোনও ভাবেই মেনে নেবে না, মানছেও না। এটা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের পরিপন্থী। একজন প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ থাকলে, যেভাবে তদন্ত এগোনো উচিত, যে ধরণের তথ্য ও প্রমান থাকা উচিত অথবা যতটা সময় নিয়ে তদন্ত করা উচিত তার কোনোটাই পালন করছে না বর্তমান ইউনূস সরকার। যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের বিরুদ্ধে। ফলে এটা বিচারের নামে প্রহসন হিসেবেই দেখা হবে, যে দাবি প্রথম থেকেই করে আসছেন শেখ হাসিনা।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ তখনই মান্যতা দেবে যখন অভিযুক্ত গ্রেফতার হবেন। যা শেখ হাসিনা হননি। এর আরেকটা কারণ হল, প্রধান অভিযুক্তকে ছাড়া বিচার প্রক্রিয়া চালানো আন্তর্জাতিক নিয়মবিরুদ্ধ। ফলে এখানেও অ্যাডভান্টেজ শেখ হাসিনা।
জাতিসংঘের দুটি শর্ত এক্ষেত্রে উল্লেখ করা যায়। প্রথমকৃত আগেই বললাম। দ্বিতীয়টি হল অভিযুক্তকে কখনোই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে না। মূলত এই দুই শর্তেই বাংলাদেশের অন্তবর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনার বিচার নিয়ে ব্যাকফুটে। ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্ট বা আইসিসি এই দুই নিয়ম মেনেই চলে। আর সে কারণেই নানান হম্বিতম্বি সত্ত্বেও আইসিসি-তে শেখ হাসিনার নামে মামলা করতে পারছে না মুহাম্মদ ইউনুসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও কিছু সমস্যা রয়েছে। যেমন তিনি ঢাকার অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নিজের কোনও আইনজীবী নিয়োগ করতে পারছেন না। তিনি যদি আত্মসমর্পণ করতেন অথবা গ্রেফতার হতেন, তাহলে তিনি নিজের পছন্দের দেশি অথবা বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ করতে পারতেন। ঠিক এই কারণেই হাসিনার বিরুদ্ধে চলা মামলায় রাষ্ট্র একজন আইনজীবীকে নিযুক্ত করেছে। এবার তিনি হাসিনার পক্ষে যতটা ভালো সাওয়াল করবেন, নিশ্চয়ই তার থেকেও ভালো সবার করতেন হাসিনার ব্যক্তিগতভাবে নিযুক্ত আইনজীবীরা। যদি ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে শুরু হওয়া বিচার প্রক্রিয়াকে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রহসন বলেই মনে করেন তাহলে তাঁর কিছুই যায় আসে না। আর মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসনও অযথা তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে হাতের বাজি নষ্ট করে ফেলেছে।
কিন্তু এত কথা তখনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে যখন শেখ হাসিনা স্বমহিমায় ফিরবেন ঢাকায়। আবার এমনটাও হতে পারে, আন্তর্জাতিক মহলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চালানো প্রোপাগান্ডা ফলপ্রসূ হল। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি বিবিসি বা আল জাজিরার মত আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম জুলাই আন্দোলন ও আগস্টের গণ অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার দমনপীড়ন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। এই সব কিছুকেই ছাপিয়ে যেতে হবে আওয়ামী লীগ নেত্রীকে। তবে একটা ব্যাপারে নিশ্চিত করে বলা যায়, ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হওয়া শেখ হাসিনার বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের নিরিখে ব্যর্থ। কারণ তাকে গ্রেফতার করতে পারেনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর ঢাকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারপতিরাও পরিবর্তিত হয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে। সব মিলিয়ে অ্যাডভান্টেজ শেখ হাসিনা, সৌজন্যে জাতিসংঘের রিপোর্ট।











Discussion about this post