প্রতিবেদন মনে করায় রবীন্দ্রনাথের পুজা পর্যায়ের এই গান – “কী করিলি মোহের ছলনে”। সেই গানে একটি লাইন রয়েছে – “বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল, কে আর রহিল এ বনে”। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে আমেরিকার অবস্থা জানাতে হলে লাইনটা এভাবেই ঘুরিয়ে লেখা যেতে পারে “বন্ধু যাহারা ছিল সকলে চলে গেল, কে আর রহিল এ রণে।” আমেরিকার অবস্থা এখন অনেকটা এই রকম – “গৃহে ফিরে যেতে প্রাণ কাঁদিছে, এখন ফিরিব কেমনে।” কারণ “শ্রান্ত দেহ আর চলিতে চাহে না, বিধিছে কন্টক চরণে। ”
আসল বন্ধুত্বের পরিচয় হয় বিপদের সময়। আমেরিকা বেশ আত্মপ্রত্যয়ী ছিল যে মধ্যপ্রাচ্যের ব্যাপারটা তারা কম সময়ের মধ্যে মিটিয়ে নেবে। ইরানের সামরিক শক্তি তাদের সামরিক শক্তির কাছে কিছুই না। ওয়াশিটংয়ের অঙ্কের সঙ্গে বাস্তবের অঙ্ক মিলছে না। পৃথিবীর বিভিন্ন সময়ের যুদ্ধ এটা শিখিয়েছে, যে যুদ্ধকে সহজ মনে হয়, সেই যুদ্ধ গলার হার না হয়ে গলার ফাঁস হয়ে উঠেছে। ইজরায়েলের প্ররোচনায় ইরানের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মার্কিন সেনা। একসময় তাদের সঙ্গে ছিল তাদের মিত্ররা। আমেরিকার মতো তারাও নিশ্চিত ছিল ঝামেলা দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তেহরানকে অচিরেই আস্তিনের নীচে নিয়ে আসা যাবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ বলছে, ইরানের পরাজয় নিশ্চিত। তবে তারা মেরে মরবে। যুদ্ধের তেজ দেখে সেটা সহজেই অনুমান করা যায়। ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে চিন ও রাশিয়া। ফলে তেহরানের পাল্লা এখন অনেকটাই ভারী।
হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় আমেরিকা থেকে এসেছে হুমকি। ইরান ওই হুমকিকে আমল দিতে নারাজ। বলা যেতে পারে নস্যি ঝাড়ার মতো ঝেড়ে ফেলেছে। যে দেশ অন্যের বিপদে ছুটে গিয়েছে, আজ সেই আমেরিকার বিপদে পাশে নেই তারাই। এমন দিন যে আসতে পারে, সেটা কল্পনাও করতে পারেননি ট্রাম্প। ফলে, ফাঁকা মাঠে গোল দিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার যে স্বপ্ন আমেরিকা দেখেছিল, সেই স্বপ্নকে ইরান একের পর এক ক্ষেপণাস্ত্র চালিয়ে মাঝ আকাশেই গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আমেরিকা ন্যাটোর কাছে সাহায্য চেয়েছিল। ন্যাটো মুখের ওপর তাদের “না ” বলে দিয়েছে। ব্রিটেন, ফ্রান্স, ইটালি, জার্মানি সবার মুখে এক রা – এই যুদ্ধে আমরা তোমার পাশে নেই। এদের মধ্যে কোনও কোনও দেশ সরাসরি না বলেছে। কেউ ভদ্রভাবে পাশ কাটিয়েছে। স্পেন আমেরিকাকে বলে দিয়েছে – এই লডা়ই তোমার।
এই প্রসঙ্গে একটি প্রবাদের উল্লেখ করা যেতে পারে। প্রবাদটি হল নদীর জল শুকিয়ে গেলে ক্ষেত তৈরি হয়। আর হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে বিশ্ব অর্থনীতির চাকা কেঁপে ওঠে। তেহরান ঠিক সেটাই করেছে। আমেরিকার হুমকির পরেও তারা তাদের অবস্থানে অনড় রয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রণালী জোর করে খুলতে চেয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট। সে কারণে তিনি আমেরিকার মিত্রদেশগুলির কাছে আর্জি জানিয়েছিলেন পাশে থাকার। কেউ কথা রাখেনি। কেউ এগিয়ে আসেন। যুদ্ধের ময়দান শুধু সাহসের খেলা নয়, এটা একটা হিসেবের খেলা।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ আমেরিকার কাছে এখন ‘অভিমন্যুর চক্রগৃহে’ পরিণত হয়েছে। ঢোকার আগে ঠিক করে রাখতে হয় বেরিয়ে আসার রাস্তা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আমেরিকা মারাত্মকরকম ভুল করেছে। ইরাক যুদ্ধ থেকে তাদের শিক্ষা হয়নি। তাই, শরৎ চন্দ্রের মেজদার মতো তৃতীয়বারের জন্য আবার পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়েছে। এই যুদ্ধ এখন আমেরিকার কাছে শাঁখের করাত হয়ে উঠেছে। যেদিকেই পা রাখবে, করাতে তাদের পা কাটবে। ট্রাম্প সদম্ভে ঘোষণা করে চিন, ফ্রান্স, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ব্রিটেন – সবাই যেন হরমুজে জাহাজ পাঠায়। ধরে নেওয়া হয়েছিল, ডনের ডাকে সাড়া দিয়ে সবাই হরমুজে জাহাজ পাঠাবে। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা গেল কেই ট্রাম্পের পাশে দাঁড়াল না। ট্রাম্পের মতো সে দেশের শীর্ষনেতারা কখনই চাইবেন না বিশ্বে তাদের দেশের পরিচয় হোক একটি যুদ্ধবাজ দেশ হিসেবে।












Discussion about this post