ইরানের সঙ্গে আমেরিকা ও ইজরায়েলের চলা যুদ্ধকে সমর্থন না দিয়ে নিজের দায়িত্ব থেকে সরে গেলেন মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের (এনসিটিসি) পরিচালক জো কেন্ট। মঙ্গলবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে তিনি তাঁর পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরে তিনি সেই পদত্যাগপত্র সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করেন। কেন্ট বলছেন, ইরানের বিরুদ্ধে চলমান এই যুদ্ধকে তিনি সমর্থন করতে পারছেন না। ইরান যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো হুমকিও তৈরি করেনি। হুমকি ছিলও না। ইজরায়েলের চাপেই আমেরিকা এই যুদ্ধে জড়িয়েছে। এনসিটিসি পরিচালক হিসেবে গত বছরের জুলাই মাসে তাকে বেছে নেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। বছর না ঘুরতেই সেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ালেন তিনি। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তিনি বলছেন, নিজের বিবেকবোধ থেকেই আর এ দায়িত্ব চালিয়ে যেতে চান না। ইরান যুদ্ধ আমেরিকার জনগণের প্রাণ ও সম্পদ কেড়ে নিচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
কেন্ট তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, ‘‘ইজরায়েলের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রভাবশালী সদস্যরা একটি সুপরিকল্পিত ‘ভুল তথ্য প্রচারের অভিযান’শুরু করে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উদ্দ্যেশে তাঁর বার্তা – “এটি আপনার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে পুরোপুরি ধ্বংস করে দিয়েছে।ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করতে সাধারণ মানুষের মধ্যে যুদ্ধের উন্মাদনা ছড়িয়ে দিয়েছে।’’ মার্কিন ন্যাশনাল কাউন্টার টেরোরিজম সেন্টারের পরিচালক তাঁর পদত্যাগ পত্রে লিখেছেন ‘‘আপনাকে এটা বিশ্বাস করাতে ধোঁকা দেওয়া হয়েছে যে, আমেরিকার জন্য এক আসন্ন হুমকি ইরান। তাই এখনই হামলা করলে দ্রুত বিজয় অর্জন সম্ভব। এটি একটি ডাহা মিথ্যা ছিল। ঠিক একই কৌশল ব্যবহার করে ইজরায়েলিরা আমাদের সেই ভয়াবহ ইরাক যুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল।’’
একসময় ট্রাম্পের নির্বাচনি প্রচার ও পররাষ্ট্র নীতির সমর্থক ছিলেন কেন্ট। সেই কথা তুলে ধরে ট্রাম্পকে লেখা পদত্যাগপত্রে তিনি বলেন, “আমি ২০১৬, ২০২০ ও ২০২৪ সালের প্রচারণায় আপনার ঘোষিত মূল্যবোধ ও পররাষ্ট্রনীতিকে সমর্থন করি, যা আপনি আপনার প্রথম মেয়াদে কার্যকর করেছিলেন। ২০২৫ সালের জুন মাস পর্যন্ত আপনি নিজেও বুঝেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধগুলো একটি ফাঁদ, যা আমেরিকার দেশপ্রেমিকদের মূল্যবান প্রাণ কেড়ে নেয় এবং আমাদের জাতির সম্পদ ও সমৃদ্ধি শেষ করে দেয়।” নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, “একজন অভিজ্ঞ সেনা হিসেবে ১১ বার যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। একজন ‘গোল্ড স্টার’ স্বামী হিসেবে ইসরায়েলের তৈরি একটি যুদ্ধে নিজের প্রিয়তমা স্ত্রী শ্যাননকে হারিয়েছি।
“তাই আমি পরবর্তী প্রজন্মকে এমন একটি যুদ্ধে লড়াই করতে আর মরতে পাঠানোর সমর্থন দিতে পারি না, যা আমেরিকার জনগণের কোনো উপকারে আসে না। অথবা প্রাণের বিনিময়েও যাকে ন্যায়সঙ্গত বলা যায় না।” রয়টার্স লিখেছে, কিছু বিশেষজ্ঞ বলছেন, বর্তমান আইন অনুযায়ী কোনো যুদ্ধ শুরু করার জন্য আমেরিকার জন্য একটি ‘আসন্ন হুমকি থাকা আবশ্যক’। রয়টার্সের অনুরোধে কোনো তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি হোয়াইট হাউস। ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টরের কার্যালয় থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য মেলেনি। অপরদিকে জো কেন্টের আকস্মিক পদত্যাগে বিস্মিত হয়েছেন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। হঠাৎ এমন কাণ্ডে তারা বেশ ‘অপ্রস্তুত’ হয়ে পড়েছেন। মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের জন্য এই পদত্যাগের খবরটি ছিল অনেকটা বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো। কেন্টকে ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স তুলসী গ্যাবার্ডের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বলে মনে করা হয়। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তুলসী গ্যাবার্ড নিজেকে আডা়লে রেখেছেন। যুদ্ধে নিহত মার্কিন সেনাদের মরদেহে শ্রদ্ধা জানানো ছাড়া তাঁকে জনসমক্ষে খুব একটা দেখা যায়নি। এখনও পর্যন্ত তিনি প্রকাশ্যে বিবৃতিও দেননি। জো কেন্টের এই আচমকম ইস্তফা ট্রাম্প প্রশাসনের অভ্যন্তরে চলতে থাকা উত্তেজনা এবং মতভেদকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এল। ট্রাম্প কেন্টকে দূর্বল বলে উপহাস করেছেন। হোয়াইট হাউজ এই পদত্যাগকে হাস্যকর বলে মন্তব্য করে। তবে বহু ডেমোক্র্যাট ও রিপাব্লিকান নেতা এই যুদ্ধকে ইহুদি বিদ্বেষী বলে মন্তব্য করেছেন। আমেরিকায় সামনেই অন্তর্বর্তী নির্বাচন। কেন্টের পদত্যাগে ট্রাম্প সমর্থকদের অনেকেই সংশয়ে ফেলে দেবে বলে মনে করছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।












Discussion about this post