বাংলাদেশে জামায়তে ইসলামীর সঙ্গে আমেরিকার কি বোঝাপড়া হয়ে গিয়েছে? কয়েকদিন আগেই ওয়াশিংটন পোস্টে একটি প্রতিবেদনের দাবি ঘিরে এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছিল বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। কিন্তু বাংলাদেশে নতুন নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ঢাকার আসার পর থেকে বিএনপি-সহ একাধিক রাজনৈতিক দল এবং একাধিক সংগঠনের সঙ্গে বৈঠক করলেও বাংলাদেশের জামায়তে ইসলামীর সঙ্গে কোনও বৈঠক করেনি। যদিও মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের খবর ছিল, আগামী সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর ভোট বাক্সে তাঁদের সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে প্রস্তুত। আর এ প্রেক্ষাপটে মার্কিন কূটনীতিকরা দলটির সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। ওয়াশিংটন পোস্টের দাবি, তাঁদের হাতে আসা একটি অডিও রেকর্ড থেকে এই প্রতিবেদন তৈরি করেছে তাঁরা। ওই অডিও টেপের নীরিখে ওয়াশিংটন পোস্ট দাবি করেছিল, কোনও এক মার্কিন কূটনৈতিক বাংলাদেশের নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে বলেছিলেন, আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী আগের চেয়ে ভালো করবে। ওই কূটনৈতিক আরও দাবি করেছিলেন, আমরা চাই তাঁরা অর্থাৎ জামায়তে ইসলামী আমাদের বন্ধু হোক। তখনই বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল এবং ভারতের কূটনৈতিক মহলেও ব্যাপক শোরগোল পড়ে যায়। তাহলে কি বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠনগুলির প্রতি তাঁদের মনোভাব পরিবর্তন করছে?
ঘটনাচক্রে, বাংলাদেশে নিযুক্ত নতুন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন সেই পথে হাঁটছেন না। তিনি কৌশলী অবস্থান নিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র সরকার বাংলাদেশের নির্বাচনে কোনও পক্ষের প্রতি অবস্থান নেবে না। এই নির্বাচনের ফল কী হবে, তা নির্ধারণ করবেন কেবলমাত্র বাংলাদেশের জনগণ। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের জনগণ যে সরকারকে নির্বাচিত করবে, আমরা তাদের সঙ্গেই ভবিষ্যতে কাজ করতে প্রস্তুত। এ তো গেল সাদামাটা কূটনৈতিক বার্তা। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-সহ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেও এখনও পর্যন্ত জামায়তে ইসলামীর কোনও নেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ বা বৈঠক করেননি। এটাও একটা বার্তা বলে মনে করছেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল।
উল্লেখ্য, গত ১২ জানুয়ারী, বাংলাদেশে নিযুক্ত চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন অপ্রত্যাশিতভাবে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত শীতকালীন পোশাক বিতরণ অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে গিয়ে জামায়াতের “মানবিক” কর্মকাণ্ডের জন্য চিনা রাষ্ট্রদূত ফলাও প্রশংসাও করেন। বিশেষ করে জামায়তের অনাথআশ্রম এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন বাংলাদেশে চিনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এটা অনেকেরই ভ্রু কুঁচকে দিয়েছিল। কারণ, ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রতিষ্ঠার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, সেই ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর চিনা রাষ্ট্রদূত জামায়াতের কেন্দ্রীয় কার্যালয় পরিদর্শন করেছিলেন। জামায়তের আমির শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল বেজিং সফরও করে এসেছিলেন। ফলে বিষয়টিকে কোনও ভাবেই বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখতে নারাজ রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক মহল। কারণ এই সমস্ত ঘটনাবলী বাংলাদেশের ইসলামপন্থী দলটির সঙ্গে বেজিংয়ের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। তাই খুব স্বভাবতই কোনও এক মার্কিন কূটনৈতিকের অডিও টেপের বরাত দিয়ে ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদন অনেককেই অবাক করেছিল।
তবে ওয়াকিবহাল মহল বলছে, কূটনীতির ভাষা একটু ভিন্নধর্মী। ওয়াশিংটন পোস্ট কোনও ভাবেই বলেনি, ওই অডিও টেপ কবেকার। খুব সাম্প্রতিক, নাকি পূর্ববর্তী রাষ্ট্রদূত পিটার হাসের আমলের। কারণ, পিটার হাসের পর বাংলাদেশে স্থায়ী কেউ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ছিলেন না। দায়িত্ব সামলেছিলেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স ট্রেসি অ্যান জেকবসন। তিনি লন্ডনে ছুঁটে গিয়ে বিএনপি নেতা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তারপরই সেখানে যান বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। বিষয়টি খুবই লক্ষ্যনীয়। আবার বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক প্রাক্কালে বাংলাদেশে স্থায়ী রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হলেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন। তিনিও তারেকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন, কিন্তু এখনও পর্যন্ত জামাত নেতা বা এনসিপির কোনও প্রতিনিধির সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করলেন না। যা অত্যন্ত ইঙ্গিতবাহী বলেই মনে করছে সংশ্লিষ্টমহল। কেউ কেউ বলছেন, ভারতের পরামর্শেই জামায়ত এবং এনসিপি নেতাদের সংস্পর্ষ এড়িয়ে চলছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ, দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিতে চাইছে ট্রাম্প প্রশাসন। ভারতে যাকে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানো হয়েছে, সেই সার্জিও গোরকেই আবার দক্ষিণ এশিয়ার বিশেষ দূত করা হয়েছে। তিনি দিল্লি থেকেই এই গোটা অঞ্চলের কাজকর্ম দেখভাল করবেন। বাংলাদেশ নিয়ে যেমন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসন ব্যস্ত, তেমনই সার্জিও গোর। ফলে দুই আর দুইয়ে চার করলে বিষয়টি দাঁড়ায়, ভারতের পরামর্শেই জামায়তকে এড়িয়ে চলছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।












Discussion about this post