রবিবার বাংলাদেশের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হল বাংলাদেশ নৌবাহিনীর গ্রীষ্মকালীন রাষ্ট্রপতির কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠান। সেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। এই অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি কিছু মন্তব্য করেন, যা নিয়ে ইতিমধ্যেই কাঁটাছেঁড়া শুরু হয়েছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে। কি বলেছেন তিনি?
সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান বলেন, ‘বাংলাদেশ নৌবাহিনী অত্যন্ত সুসজ্জিত একটি বাহিনী। দেশের সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা, সমুদ্র সম্পদের সুরক্ষা, সমুদ্রে অপরাধ দমন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে নৌবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। পাশাপাশি তিনি সদ্য যোগ দেওয়া নবীন অফিসারদের উদ্দেশ্যে বলেন, সততা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের চেতনায় বলীয়ান হয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নবীন কর্মকর্তাদের সবসময় প্রস্তুত থাকতে হবে।
বাইট – জেনারেল ওয়াকার উজ জামান
আপাত দৃষ্টিতে সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য সাধারণ মনে হলেও, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ের নিরিখে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশীদের হাতে তুলে দেওয়া এবং রাখাইন মানবিক করিডোরের আড়ালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে একটি সামরিক ঘাঁটি তৈরি করতে দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূস প্রশাসন। যার তীব্র বিরোধিতা করছে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামাম ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের বক্তব্য, মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সঙ্গে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সম্পর্ক একেবারেই তলানিতে এসে ঠেকেছে। এর মূল কারণ, বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে খলিলুর রহমানের নিয়োগ এবং তাঁকে কার্যত সেনাবাহিনীর মাথায় বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। যা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মধ্যেই মতোবিরোধের সৃষ্টি করেছে। জানা যাচ্ছে, কয়েকজন লেফটান্যান্ট জেনারেল ও মেজর পদমর্যাদার সেনা আধিকারিক ইউনূসবাহিনীর সঙ্গে আঁতাত করে সেনাপ্রধানকেই সরানোর চেষ্টায় রয়েছেন। এই অংশটির মধ্যে বেশিরভাগই জামাতপন্থী বা পাকিস্তানপন্থী এবং বয়সে নবীন। ফলে সদ্য কমিশনড হওয়া নৌবাহিনীর নবীন কর্মকর্তাদের দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় সব সময় প্রস্তুত থাকার আহবান জানিয়ে এবং বাহিনীর সততা, শৃঙ্খলা ও আত্মত্যাগের চেতনায় বলীয়ান হতে বলে আসলে বুঝিয়ে দিলেন, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে। তিনি যেমন ওই নবীন কর্মকর্তাদের বলেছেন, বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর মূলমন্ত্র ‘শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্র দুর্জয়’, এটাতে উজ্জীবিত হয়ে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা হবে তোমাদের জীবনে প্রথম এবং প্রধানতম ব্রত।
বাইট – জেনারেল ওয়াকার উজ জামান
বাংলাদেশে সেনাপ্রধানের বক্তব্যে মাতৃভূমির স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখার আহ্বান বারবার ছিল। এটাই মূল বিষয়। তিনি আসলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বার্তা দিতে চেয়েছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনও পরিস্থিতিতেই রাখাইন মানবিক করিডোর মেনে নেবে না। যদিও জানা যাচ্ছে, ২০ জুন থেকেই বেশ কিছু মার্কিন সেনা আধিকারিক ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা ঢাকায় পৌঁছতে শুরু করেছেন। ঢাকা থেকে তাঁরা চট্টগ্রামের দিকে রওনাও হয়েছেন। জানা যাচ্ছে, চট্টগ্রামে আগামী ২৫ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া “অপারেশন প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল-২৫” নামক বার্ষিক মহড়ার পরিকল্পনা রয়েছে বাংলাদেশ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের। যদিও এই খবর হয়তো সেনাপ্রধানকে দেওয়া হয়নি বলেই সূত্রের খবর। বাংলাদেশ থেকে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে প্রস্তাবিত “মানবিক করিডোর” যখন পিছিয়ে পড়েছে, তখন বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীগুলি মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের আগমনকে “শঙ্কা এবং বিস্ময়” উভয়ভাবেই পর্যবেক্ষণ করছে।
মার্কিন সেনা ও বিমানবাহিনীর অফিসার এবং অন্যান্য পদমর্যাদার সদস্যরা কাতার, থাইল্যান্ড এবং অন্যান্য স্থান থেকে বিমানে ঢাকায় আসছেন। অপারেশন প্যাসিফিক অ্যাঞ্জেল ছাড়াও, মার্কিন সেনা সদস্যরা টাইগার লাইটিং-২০২৫ নামে দ্বিতীয় একটি মহড়ায়তেও অংশ নেবেন বলে জানা গিয়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশে সামরিক ঘাঁটি তৈরির পরিকল্পনা থেকে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরে আসেনি, এটা তারই প্রমান। আর সবটাই ঘটছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান-সহ তিন বাহিনীর প্রধানদের অগোচরে। এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাপ্রধানের বক্তব্য, যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।












Discussion about this post