বাংলার প্রতিটি জেলায় কোনও রাজবাড়ি বা জমিদার বাড়ির বিখ্যাত দুর্গাপুজো রয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি আবার ঐতিহাসিক। কিন্তু এমন কোনও নিদর্শন পেয়েছেন, যে রাজা বা জমিদার না হয়েও সাধারণ কোনও মানুষের বাড়ির পুজো ঐতিহাসিক তকমা পেয়েছে। ঝাড়গ্রামের বিনপুর ব্লকের হাড়দা গ্রামের পাল পরিবারে পুজো এ রকমই এক দুর্গাপুজো। পাল বাড়ির দুর্গাপুজোর বয়স পাঁচ শতাব্দী পেরিয়ে আজ ৫৫৩ বছরে পড়েছে। এই পরিবারের পুজোয় রয়েছে প্রাচীন এক ঐতিহাসিক গল্প।
জঙ্গলমহলের বিনপুরের প্রত্যন্ত গ্রাম হাড়দা। এখানকার পাল পরিবারে প্রায় এগারো পুরুষ ধরে হয়ে আসছে দুর্গা পুজো। এই পাল পরিবার কোনও কালেই জমিদার বা প্রতাপশালী ব্যবসায়ী ছিল না। বরং তাঁরা যুগ যুগ ধরেই মৃৎশিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মাটির হাড়ি, কলশি, মালসা বানিয়ে সংসার চলে। এই পালবাড়ির দুর্গাপুজোয় পিছনে রয়েছে এক ঐতিহাসিক কাহিনী। যে দুর্গা, সেই কালী। এমন বচন আমরা কয়েক যুগ ধরেই শুনে আসছি। এই দুই দেবী নাকি এগারো পুরুষ আগে পাল বংশের দুই ভাইকে জঙ্গলে দেখা দিয়েছিলেন। ৮৮০ বঙ্গাব্দে হাড়দা গ্রামেই পাল পরিবারের দুই রাম ও লক্ষণ মাটির হাঁড়ি কুড়ি বানাতেন। সেগুলিকে গরুর গাড়িতে করে বিক্রি করতেন গ্রামে গ্রামে। এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় কাঠ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে জঙ্গলে যেতে হতো তাঁদের। কথিত আছে বেলপাহাড়ির জঙ্গলে যায় কাঠ সংগ্রহ করতে একবার দুই রমণীর দেখা পান দুই ভাই। তাঁরা রাম ও লক্ষণের সঙ্গেই তাঁদের বাড়িতে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তৎকালীন সময়ে লোকলজ্জার ভয়ে দুই ভাই ওই দুই রমনীকে সঙ্গে আনতে অস্বীকার করেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পরই সেই দুই রমণীর আর খোঁজ পাননি তাঁরা। এরপরই তাঁরা স্বপ্নের মাধ্যমে জানতে পারেন, ওই দুই রমণী ছিলেন মা দুর্গা ও মা কালী। এরপরই দুই ভাই মিলে নিজেদের ভদ্রাসনে মা দুর্গা ও মা কালীর পুজো শুরু করেন। দীর্ঘসময় ধরে পাল পরিবারে নিষ্ঠার সঙ্গে দুটি পুজো হলেও কালের নিয়মে দুই পরিবার আলাদা হয়ে যায়। এবং আলাদা আলাদা ভাবেই পূজিতা হন দেবী দুর্গা ও মা কালী।
কালের নিয়মে বিনপুরের হড়দা গ্রামের পাল বাড়ির পুজো একসময় জৌলুস হারিয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে সরকারি সাহায্যে পালবাড়ির পুজোতে ফিরেছে জৌলুস। এলাকার মানুষজনও এই পুজোয় সাহায্য করেন। ফলে ইদানিং ধুমধাম করেই হচ্ছে পাল বাড়ির দুর্গাপুজো। পুজো নিয়ে বেশ উৎসব উদ্দীপনা চোখে পড়েছে।
এ বছর ৫৫৩ বছরে পড়েছে পাল বাড়ির দুর্গাপুজো। বিভিন্ন ধরনের আচার অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়েই মায়ের আরাধনায় মেতে ওঠেন গোটা পরিবার। গোটা গ্রামও ভিড় করেন। প্রসঙ্গত, দুই পরিবার আলাদা হয়ে যাওয়ার পর ঝাড়গ্রামের হাড়দা গ্রামে দেবী দুর্গার আরাধনা হলেও অপর ভাইয়ের পরিবার বাঁকুড়ার সারেঙ্গা থানার চিংড়া গ্রামে দেবী কালীর আরাধনা করে আসছেন নিয়ম নিষ্ঠা সহকারে।












Discussion about this post