বাংলার আনাচে কানাচে বিভিন্ন বনেদি বাড়িতে হয় দশভূজার আরাধনা। এরকমই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে অন্যতম হল খড়দহের ভট্টাচার্য পরিবার বা ক্ষেত্রপাল ঠাকুর বাড়ির পুজো। জাকজমকে এই পুজো কলকাতার বনেদি বাড়িগুলিকে টেক্কা দিতে না পারলেও এর প্রাচীনত্ব এবং আভিজাত্যে কোনও খামতি নেই। জানা যায়, এটি উত্তর ২৪ পরগণা জেলার দ্বিতীয় প্রাচীনতম দুর্গাপুজো। যার বয়স আনুমানিক ৫০০ বছর।
শহর কলকাতা ও আশপাশের অঞ্চলে বহু প্রাচীন বনেদি বাড়িতে দুর্গাপূজা হয়। আর প্রায় প্রতিটি বনেদি বাড়ির পুজোর গল্প সকলের পক্ষে জানা সম্ভব হয় না। এমনই এক বনেদি বাড়ি হল খড়দহ ভট্টাচার্য পাড়ার ক্ষেত্রপাল ঠাকুরবাড়ি। এখানকার দূর্গাপুজো অন্যান্য বনেদি বাড়ির পুজোর মতোই, কিন্তু বেশ কিছু স্বকীয়তা রয়েছে। খড়দহ ভট্টাচার্য পাড়ার ক্ষেত্রপাল ঠাকুরবাড়িতে মায়ের পূজোয় মহিলাদের প্রাধান্য দেওয়া হয়। প্রতিবছর পরিবারের মধ্যেই কোনও এক মহিলার নামে সংকল্প করে পুজো দেওয়ার রীতি ক্ষেত্রপাল ঠাকুর বাড়িতে। যিনি সংকল্প হবে, তিনি বাড়ির কন্যা, অথবা বাড়ির বধূও হতে পারেন। তাঁকে পুজোর কয়েকদিন পুজোর উপাচারে অংশ নিতে হয়. তেমনই পুজোর পর তাঁকে নিজ হস্তে হবিষ্য রান্না করে খেতে হয়। জানা যায় কোনও এক কালে এই পরিবারের এক বধূ সতী হয়ে স্বামীর সাথে সহমরণে গিয়েছিলেন। এর পর থেকে তাঁর স্মৃতিতে মহিলাদের নামে পুজোর সংকল্প করার রীতি চালু হয় এই পরিবারে। এছাড়াও আরও কয়েকটি ব্যতিক্রমী রীতি আছে খড়দহ ক্ষেত্রপাল ঠাকুরবাড়ির দুর্গাপুজোয়।
খড়দহের ভট্টাচার্য পরিবারে দশভুজার পুজো হয় সম্পূর্ণ ভাবে শাক্ত মতে। কথিত আছে, একটা সময় পুজোর দিনগুলিতে এখানে মোষ, ছাগ এবং মৎস্য বলি দেওয়া হতো। কিন্তু ক্ষত্রপাল ঠাকুরবাড়ির পাশেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শ্যামসুন্দর মন্দির। শোনা যায়, শ্যামসুন্দর মন্দিরের পুরোহিতরা ভট্টাচার্য পরিবারের কাছে আর্জি জানান বলি প্রথা তুলে দেওয়ার জন্য। প্রথমদিকে মন্দিরের পুরোহিতরা ভট্টাচার্য পরিবারের কাছ থেকে বলির সময় জেনে নিতেন। এরপর বলির আগেই শ্যামসুন্দরকে খাবার বা ভোগ অর্পণ করা হত। এবং তিনি সেই ভোগ গ্রহণ করে বলির আগেই নিদ্রা যেতেন। পরবর্তী সময়, শ্যামসুন্দরের মর্যাদা ক্ষুন্ন না করে পশু বলি বন্ধ করে দিয়েছেন ভট্টাচার্য পরিবার। তবে প্রাচীন রীতি মেনে আখ, চালকুমড়ো ইত্যাদি বলি হয় এখন। তবে আজও প্রাচীন রীতি মেনে বলি শুরু হওয়ার আগেই শ্যামসুন্দরের মন্দিরে বিগ্রহকে ভোগ অর্পণ করে তাঁকে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া হয়। এছাড়া ষষ্ঠী থেকে নবমী পর্যন্ত মাকে মাছ দেওয়া হয় এখানে। পাশাপাশি, সন্ধিপুজোয় এঁচোড়ের তরকারি এবং কাঁচা আমের চাটনি নিবেদন করা হয় ভোগে। একই ভাবে দশমীর ভোগে শীতল ভোগ অর্থাৎ পান্তা এবং কচুর শাক থাকে।
ভট্টাচার্য পরিবারের বর্তমান প্রজন্ম সুদীপ্ত ভট্টাচার্য জানালেন আরও এক আশ্চর্য রীতির কথা। পুজোর চারদিনই মাকে দর্পনে মহা স্নান করানো হয়। এরজন্য ১০৮ ধরণের জল ব্যবহার করা হয়। সাড়া বছর ধরে ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যরা এই জল সংগ্রহ করেন। মহালয়া থেকেই ক্ষেত্রপাল রাজবাড়িতে শুরু হয়ে গিয়েছে দশভূজার আরাধনা।












Discussion about this post