বঙ্গভঙ্গের আগে পর্যন্ত দুই বাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ একই সঙ্গে ছিল। তারও আগে বঙ্গপ্রদেশ বলতে বিহার উড়িষ্যার কিছু অংশ-সহ এক বিশাল ভুখন্ডকে ছিল বোঝানো হতো। এই বঙ্গভূমিতে কবে থেকে দুর্গাপুজোর প্রচলন তা নিয়ে অনেক মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে বাংলার প্রাচীনতম দূর্গা পূজা কোনটি, সেটা নিয়েও রয়েছে বিভেদ। তবে খোদ বাংলার এই দুর্গাপুজো অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে বিগত ১০২৯ বছর ধরে। আসুন আজ আপনাদের দেখাই মল্ল রাজাদের সেই প্রাচীন দুর্গাপুজোর কিছি ঝলক।
শতাব্দী প্রাচীন দুর্গাপুজোর কথা তো আমরা হামেশাই শুনি, কিন্তু এক সহস্র বছরেরও পুরনো এক দূর্গাপুজো এই বাংলায় হয় সেটা ভাবতেই কেমন গায়ে কাটা দিচ্ছে না? বাঁকুড়ার বিষ্ণুপুরের এই দুর্গাপুজোর বয়স কম করে ১ হাজার ২৯ বছর। আজও প্রাচীন ধারা বজায় রেখে এই পুজো হয়ে আসছে। রাজবাড়ির পুজো বলে কথা, তাই এর অভিযাত্য একটু আলাদা হবে সেটা বলাই বাহুল্য। যদিও এখন আর সেই রাজা নেই, রাজ্যপাটও মুছে গিয়েছে কবেই। রয়ে গিয়েছে স্মৃতি ও এই দুর্গাপুজো। বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের কুলদেবী মৃন্ময়ীকে ঘিরে আজও হাজার গল্পকথা ঘুরে বেড়ায় বিষ্ণুপুরের আকাশে-বাতাসে। এই পুজো ঘিরে একটা আলাদা রোমান্টিকতা বিরাজ করে গোটা বিষ্ণুপুরে।
মল্লরাজ পরিবারের সদস্যরা প্রতি বছর জড়ো হন এই পুজো উপলক্ষ্যে। তাঁরা জানালেন,
প্রাচীন মৃন্ময়ী মন্দিরে হাজার বছরের রীতি মেনে আসেন বড় ঠাকরুণ, মেজ ঠাকরুণ ও ছোট ঠাকরুণ। মহালয়ার সকালে শহর কাঁপিয়ে পরপর কামানের তোপধ্বনি বুঝিয়ে দেয় পুজো এসে গিয়েছে। এই রীতি আজও পালিত হয় মল্ল রাজ পরিবারে। বিষ্ণুপুর শহরে মল্ল রাজ পরিবারের যে মন্দির রয়েছে সেখানে অধিষ্ঠান করেন দেবী মৃন্ময়ী, যিনি দুর্গারই এক রূপ।
মল্ল রাজ পরিবারের প্রাচীন ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ। কথিত আছে, ৯৯৭ সালের কোনও একটি সময়ে ১৯তম মল্লরাজ জগৎমল্ল জঙ্গলে শিকার করতে বেরিয়ে পথ হারিয়ে ফেলেন। ক্লান্ত জগৎমল্ল একসময় একটি বটগাছের তলায় বসে বিশ্রাম করছিলেন। মহারাজ ঘুমিয়ে পড়েন বটগাছের নীচেই এরপর তিনি দেবী মৃন্ময়ীর মন্দির স্থাপন করার দৈববাণী পান। নির্দেশ মতো রাজা জগৎমল্ল বটগাছের নীচে এক সুবিশাল মন্দির তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি মল্লরাজ জগৎমল্ল ঘন জঙ্গল কেটে এই মন্দিরের আশেপাশেই তাঁর রাজধানী সরিয়ে এনে বিষ্ণুপুর শহরের পত্তন করেন। ফলে বোঝাই যাচ্ছে কত প্রাচীন এই মন্দির ও পুজো। এরপর দীর্ঘ ১০২৯ বছর ধরে বহু উত্থান-পতনের সাক্ষী রয়েছেন মল্লরাজদের কুলদেবী মৃন্ময়ী। পরবর্তী মল্লরাজারা বৈষ্ণব ধর্মে দীক্ষিত হলে শব্দকে ব্রহ্মজ্ঞান করে তোপধ্বনির প্রচলন শুরু করেন। সেই থেকে আজও দুর্গাপুজো শুরু হয় তোপধ্বনি দিয়ে। মৃন্ময়ী মন্দিরের পাশে গোপালসায়েরের পাড়ে আজও কামান দাগা হয়।
মল্ল রাজ পরিবার দেবী মৃন্ময়ীয় পুজো করেন একটি প্রাচীন বিশেষ পুঁথি অনুসারে। ‘বলিনারায়ণি’ নামে সেই প্রাচীন পুঁথি আজও এক রহস্য। এই পুজো শুরু হয়, জিতাষ্টমীর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ নবমী তিথি ধরে। গঙ্গা থেকে মাটি এনে এখানে প্রতিমা নির্মাণ করা হয়। জিতাষ্টমীর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ নবমী তিথি ধরে দেবীর আগমন ঘটে প্রাচীন মন্দিরে। তিনি বড় ঠাকুরানি অর্থাৎ মহাকালী। মেজো ঠাকুরাণী অর্থাৎ মহালক্ষী এবং ছোট ঠাকুরাণী হলেন মহাসরস্বতী। এই তিন পটচিত্রকে একসঙ্গে পূজা করা হয় মল্ল রাজাবাড়িতে। মনে করা হয় মহামারী থেকে পরিত্রাণের জন্য শুরু হয়েছিল।












Discussion about this post