বিগত কয়েকদিনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি কার্যত একমুখী। রাজ্যের শাসকদল একাই সরব ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী বা সমীক্ষা নিয়ে। অথচ জাতীয় নির্বাচন কমিশন এখনও এই নিবিড় সমীক্ষা বা এসআইআর করা নিয়ে কোনও বিজ্ঞপ্তি জারিই করেনি। তাহলে কেন তৃণমূল কংগ্রেস এতটা সরব হচ্ছে? দলের দুই শীর্ষ নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় নিয়ম করে নির্বাচন কমিশনকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছেন। এটাই বা কেন হবে?
বিরোধী দল বিজেপির বক্তব্য, পিপিলিকার পাখা গজায় মরিবার তরে। তৃণমূলেরও তাই দশা হয়েছে। রজ্জুতেই সর্পভ্রম হচ্ছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের। বাংলার রাজনৈতিক মহলেরও বক্তব্য অনেকটা তাই। রজ্জুতেই সর্পভ্রম। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেনে বুঝেই না হয় না বুঝে খাল কেটে কুমির ডেকে আনছেন বলেই মত ওয়াকিবহাল মহলের। এর যথেষ্ট কারণও আছে। এসআইআর হবে কি হবে না সেটা এখনও ঠিক নয়। আর নির্বাচন কমিশনের বয়ান অনুযায়ী এটা গোটা দেশেই হবে। আপাতত বিহারে হয়েছে। এসআইআর নিয়ে সুপ্রিম কোর্টেও মামলা চলছে। যেখানে কোর্ট এখনও নির্বাচন কমিশনকে খুব একটা কড়া নির্দেশ দেয়নি। সংশ্লিষ্ট মহল বলছে, দেবেও না হয়তো। কারণ, দুটিই সাংবিধানিক সংস্থা। যাই হোক, তৃণমূল কংগ্রেসের সমস্যা কোথায় সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাক।
বিহারে এসআইআর হওয়ার পর ভোটার তালিকা থেকে ৬৫ লক্ষের বেশি নাম বাদ গিয়েছে। বাংলার রাজনৈতিক মহলের মতে, পশ্তিমবঙ্গে এই সংখ্যা এক কোটিও ছুঁতে পারে। আর এটা হলে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়বে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস। কারণ মৃত, স্থানান্তরিত, বা ভুয়ো ভোটারই হল শাসকদলের জয়ের চাবিকাঠি। ফলে ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধনী হলেই এই সমস্ত ভোটার বাদ যাবেন। আবার পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যেই সক্রিয় হয়ে গিয়েছেন। ভোটার তালিকার কাজ করার জন্য রাজ্য সরকারি কর্মচারিদের ডেপুটেশনে নেওয়া শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। আবার তাঁদের কাজে গাফেলতি পেতেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে কমিশন। যা নিয়ে সরব হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি সরাসরি নির্বাচন কমিশনকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এই রাজ্যের একজন কর্মচারিকেও সাসপেন্ড করা হবে না।
আসলে ঘটনা হল, ভোটার তালিকায় গড়মিলের অভিযোগে রাজ্যের চারজন আধিকারিকের বিরুদ্ধে রাজ্যের মুখ্যসচিবকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে সাসপেন্ড করে এফআইআর করার নির্দেশ দিয়েছে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনি আধিকারিকের দফতর। চারজনের মধ্যে দুজন আবার ডবলুবিসিএস অফিসার। এরপরই আতঙ্কে পড়ে গিয়েছেন বিসিএস আধিকারিকরা। তাংদের সামনে এখন মূল প্রশ্ন শ্যাম রাখি না কূল রাখি। ফলে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিবের কাছে চিঠি দিয়েছে ডবলুবিসিএস অফিসার সংগঠন। যদিও আইন বলছে, রাজ্য সরকার যদি নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ না মানে তবে ঘোর সংকটে পড়তে হবে। তৃণমূলের সাংসদ তথা সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও বিধানসভা নির্বাচনের এত আগে রাজ্যে মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট জারি করা নিয়ে নির্বাচন কমিশনকে তোপ দেগেছেন।
কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে বা একজন সাংসদ হয়েও নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার জানেন না বা বোঝেন না এটা তো হয় না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভ অ্যাক্ট, ১৯৫০ অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে রাজ্যের কোনও কর্মচারিকে ডেপুটেশনে নেওয়ার। এবং তাঁদের কাজে গাফিলতি বা দুর্নীতি থাকলে শাস্তি দেওয়ার। এ ক্ষেত্রে আইন অনুযায়ী ওই কর্মচারির জেল ও জরিমানা দুই হতে পারে। এমনকি তাঁর চাকরি পর্যন্ত যেতে পারে। আর এই আইন না মানা, বা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অগ্রায্য করা কোনও রাজ্য সরকারের পক্ষে আইনেরই অপলাপ করার সামিল। ফলে যদি রাজ্য সরকার ওই কর্মচারিদের শাস্তি না দিয়ে বা তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না গ্রহন করে তাহলে সংবিধানকেই অস্বীকার করা হবে। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, খাল কেটে কুমির আনছে তৃণমূল কংগ্রেস। শুধুমাত্র এই কারণেই রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ আদালতও হয়তো তাঁদের যুক্তি মানতে বাধ্য হবে। কারণ, সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, সেটা কার্যত অপরিসীম।












Discussion about this post