একটি জাতির ভাগ্য গঠনে সময় যেমন মুখ্য, তেমনই নেতৃত্বের ভূমিকাও অপরিহার্য। শেখ হাসিনা এমনই একজন নেত্রী। তিনি বহুবার মৃত্যুর মুখ থেকেও ফিরে এসেছেন। এবার তাঁর সামনে কঠিন লড়াই। তিনি পারবেন ফিনিক্স পাখির মতো উঠে এসে বাংলাদেশকে রক্ষা করতে?
৪৪ বছর আগের কথা, ১৯৮১ সালের ১৭ মে। সেদিন ঢাকার আকাশে মেঘের ঘনঘটা, তীব্র ঝড়-বৃষ্টির মাঝেও ঢাকা বিমানবন্দরে লাখো মানুষের ভিড়। তাঁরা যাকে বরণ করতে এসেছেন তিনি কার্যত নির্বাসিত ছিলেন বিদেশে। তিনি শেখ হাসিনা। প্রেক্ষাপট রক্তাক্ত আগস্ট এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হয়েছিল। সেদিন বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা হাসিনা এবং রেহানা জার্মানিতে থাকায় প্রাণে বেঁচেছিলেন। পরবর্তী ৬ বছর তাঁরা ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে ছিলেন। বাংলাদেশে তখন সামরিক শাসন। স্তব্ধ বাক-স্বাধীনতা, গণতন্ত্র বোতলবন্দি। আর আওয়ামী লীগ কার্যত নেতৃত্বশূন্য ও বিপর্যস্ত। ঠিক সেই প্রেক্ষাপটেই ১৯৮১ সালের ১৭ মে দিল্লি থেকে ঢাকায় অবতরণ করেছিলেন শেখ হাসিনা। খাদের কিনারায় থাকা বিপর্যস্ত একটা দলকে নিজের কাঁধে তুলে এগিয়ে গিয়েছিলেন স্বর্ণালী এক অধ্যায়ের দিকে। সেই দলটিই ছিল আওয়ামী লীগ, আর সেই দলের সর্বোচ্চ নেত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন সেই অসম সাহসী মহিলা, যিনি বারবার মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেও শিঁড়দাঁড়া সোজা রেখে লড়াই চালিয়ে গিয়েছেন। বর্তমান সময়ে, ২০২৪ সালের সেই রক্তাক্ত আগস্ট, ফের আক্রান্ত আওয়ামী লীগ। গণঅভ্যুত্থানের নামে বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো রাজনৈতিক দলকে কার্যত আস্তাকুঁড়ে ছুড়ে ফেলা হল। তারপর কেটে গিয়েছে ৯ মাসের বেশি সময়। পদ্মা ও যমুনা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। কিন্তু আওয়ামী লীগকে কোনও ভাবেই দমানো যায়নি। তাই সংবিধান বহির্ভূত ও অগণতান্ত্রিকভাবে আওয়ামী লীগকে বাতিল করতে হল একদল তরুণ পথভ্রুষ্ট ছাত্রের দাবিতে। সবটাই যেন যাত্রাপালার চিত্রনাট্য। কারণ, আওয়ামী লীগ বারবার হারিয়ে গিয়েও ফিরে এসেছে স্বমহিমায়। বিশেষ করে নেত্রী শেখ হাসিনা, তিনি যেন লৌহমানবী। ফলে এই দল ও তাঁদের নেত্রীকে কোনও ভাবেই বাংলাদেশে ঢুকতে দেওয়া যাবে না। না হলে গণতন্ত্র আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বাংলাদেশে। যা চায় না বর্তমান যুব সমাজ। তাঁদের লক্ষ্য ইসলামিক বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু কি চায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ? আসুন একবার বোঝার চেষ্টা করি।
বর্তমান বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অন্যতম মুখ, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। নয় মাস আগেও যিনি বলেছিলেন, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার পক্ষে তিনি নয়। সত্যিকারের যদি আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ থাকে তবে সততার সঙ্গে তদন্ত করে তা করা যেতে পারে।
বাইট – আসিফ নজরুল, আইন উপদেষ্টা-বাংলাদেশ (ফাইল ভিডিও) NAZRUL 1
নয় মাস পর আচমকা বাংলাদেশের আইন উপদেষ্টার মত পাল্টে গেল। রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এর পিছনে রয়েছে জামাত ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বা জাতীয় নাগরিক পার্টির চাপ। মূলত তাঁদের চাপের কাছেই মাথা নত করতে হল বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে। তাই সরকারিভাবে বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা হল। আর এই ঘোষণা দিলেন সেই আসিফ নজরুলই।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনকে হাতিয়ার করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেছে। এরপর বাংলাদেশের নির্বাচান কমিশনও আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিল করল। ফলে আগামীদিনে বড় কোনও অঘটন না ঘটলে নৌকা চিহ্নে আর কেউ ভোটে লড়তে পারবে না। কিন্তু আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কি বক্তব্য। সেটা একবার জেনে নেওয়া প্রয়োজন। কারণ, নির্বাচন কমিশনের হিসেব অনুযায়ী, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের প্রায় ৫০ শতাংশ ভোট রয়েছে। এমনকি দেশের সিংহভাগ মানুষই হয় আওয়ামী লীগের সদস্য বা সমর্থক।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের বক্তব্য, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ না করে আগে বিচার করা উচিৎ ছিল। কারণ, সব আওয়ামী নেতা অসৎ নয়। তাঁদের আরও বক্তব্য, ব্যক্তি দোষ করতে পারে, পার্টি নয়। তাই আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা উচিৎ হয়নি। ভোটে লড়ার অধিকার সকলেরই আছে।
বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের একাংশের বক্তব্য, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচক, বৈদেশিক রিজার্ভ, নারী শিক্ষার হার, স্বাস্থ্যসেবার মান, কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল। পদ্মাপাড়ের দেশটি স্বপ্নের পথে—‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’-এর দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল হাসিনার নেতৃত্বে। কিন্তু তাঁর দোষ ছিল তিনি বাংলাদেশকে বিক্রি করতে চাননি মার্কিন আধিপত্যবাদের কাছে। তিনি বৃহত্তর প্রতিবেশি ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে বাংলাদেশকে উন্নতির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাইছিলেন। চিনকেও কৌশলগত অংশিদার করতে চেয়েছিলেন। তিনি গণতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরে এগোচ্ছিলেন, বরং কট্টরপন্থী ইসলামিক শক্তিগুলিকে দূরে ঠেলে দিতে চেয়েছিলেন। তাই তাঁকে গভীর চক্রান্তের শিকার হতে হল। ২০২৫ সালেও সেই ৪৪ বছর আগের স্মৃতি তাই ভেসে উঠছে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মনে। আবারও সেই মে মাস। এবারও তিনি ভারতের রাজনৈতিক আশ্রয়ে। তবে এবারও শেখ হাসিনা ফিনিক্স পাখির মতোই আগুন থেকে উঠে এসে হাল ধরবেন বাংলাদেশের? উত্তর লুকিয়ে কালের গর্ভে।












Discussion about this post