বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধানের পদ ছাড়ছেন মহম্মদ ইউনূস? বৃহস্পতিবার দিনভর এমন জল্পনা-কল্পনা ঘুরপাক খেল গোটা বাংলাদেশ জুড়ে। তোলপাড় সোশ্যাল মিডিয়া, তোলপাড় গণমাধ্যম। শেষে বৃহস্পতিবার রাতে সেই জল্পনায় আরও হাওয়া দিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। যিনি দলবল নিয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকারি বাসভবনে যমুনায় গিয়েছিলেন। ঘন্টাখানাকের বেশি সময় বৈঠক শেষে বেরিয়ে নাহিদ সাংবাদিকদের বলেন, ইস্তফা দেওয়ার কথা ভাবছেন মহম্মদ ইউনূস। যদিও তাঁর দাবি, তাঁরা স্যার, অর্থাৎ মুহাম্মদ ইউনূসকে এই ভাবনা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেছেন।
গত বছর অগস্ট মাসে বাংলাদেশে বৈষম্যবিরোধী গণ আন্দোলনের মুখেই পতন হয়েছিল শেখ হাসিনার আওয়ামী লিগ সরকারের। প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর আন্দোলনকারী এই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতারা মিলেই তৈরি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। আর সেই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা পদে বসানো হয় নোবেলজয়ী মহম্মদ ইউনূসকে। ৯ মাস ঘুরতেই নাটকীয় পট পরিবর্তন। কিন্তু কেন পদত্যাগ করতে চাইছেন মুহাম্মদ ইউনূস? বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলে চলছে জোরদার কাঁটাছেড়া।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশে প্রস্তাবিত মানবিক করিডর দেওয়া নিয়ে সম্প্রতি ইউনূস প্রশাসন যে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সমস্যার সূচনা শেখান থেকেই। বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এই করিডর দেওয়ার বিরুদ্ধে। তিনি তাঁর দাবিতে অনড়। ফলে পিছু হটতে বাধ্য হয়েছিল ইউনূস বাহিনী। সেনাপ্রধান বুঝতে পেরেছিলেন, আমেরিকার হাতে চট্টগ্রাম বন্দর তুলে দেওয়া এবং আরাকান আর্মিকে আগ্নেয়াস্ত্র সরবরাহের অছিলায় মানবিক করিডর গড়ে তোলাই ছিল মুহাম্মদ ইউনূস, খলিলুর রহমানদের মূল পরিকল্পনা। যা আদতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সেন্ট মার্টিন বা কক্সবাজারে একটা সামরিক বেস তৈরি করতে দেওয়ার প্রথম ধাপ। তাই জেনারেল ওয়াকার এর বিরোধিতা করেছেন। সেই সঙ্গে তিনি তিন বাহিনীর প্রধান-সহ বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা বড় অংশের সমর্থন পেয়েছেন। তাই বাধ্য হয়েই পিছু হটতে হল ইউনূস বাহিনীকে। এখন যে প্রশ্নটা সবচেয়ে বেশি আলচ্য সেটা হল, পদত্যাগ করতে চেয়ে কি সত্যিই রণে ভঙ্গ দিলেন নোবেলজয়ী?
সূত্রের খবর, বৃহস্পতিবার রাতে মুহাম্মদ ইউনূস তাঁর দোসর অর্থাৎ জাতীয় নাগরিক পার্টির পদাধিকারীদের ডেকেছিলেন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করতে। জানা যাচ্ছে, নাহিদ ইসলাম-নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারি-সারজিস আলম ও হাসনাত আব্দুল্লাহদের সঙ্গে প্রায় তিন ঘন্টা বৈঠক করেন মুহাম্মদ ইউনূস। ওই বৈঠকে তিনি রীতিমতো উত্তেজিত ছিলেন বলেও জানা যায়। তিনি বলেছেন, ‘সময় এসেছে সেনাপ্রধান ও রাষ্ট্রপতিকে পদ থেকে সরানোর। মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের একত্রিত করে দুজনের বিরুদ্ধে জন আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে’। এই পরিকল্পনা যদিও তাঁদের বহুদিনের। মূলত জামাত ও পাকিস্তানপন্থী সেনাকর্তাদের নিয়ে জেনারেল ওয়াকারকে সরানোর প্রচেষ্টা আগেও দুবার হয়েছে। কিন্তু তা সফল হয়নি। সূত্রের খবর, এবার পরিকল্পনা আরও বড়। ঠিক যেভাবে শেখ হাসিনা বিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল গোটা বাংলাদেশ জুড়ে। এবার সেই ধাচেই গণ আন্দোলনের কথা ভাবা হয়েছে। নাগরিক পার্টির আড়ালে এই পাক পন্থী ছাত্র নেতারা প্রস্তাব দেন, জামায়াত ইসলামী-হিযবুত তাহরীর ও আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের শীর্ষ নেতৃত্বকে দায়িত্ব দেওয়া হোক। পাশাপাশি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে থাকা পাকিস্তানি এজেন্ট বা লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফইজুর রহমানদের আরও সক্রিয় হতে বলা হয়েছে। ঠিক হয়েছে, ওয়াকার-উজ জামানকে হটাতে শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদকারীরা এবার ফের রাস্তায় নামবেন। একদিকে জামাত, হিজবুত ও এবিটি-র মতো জঙ্গি সংগঠন তাঁদের মতো করে প্রচার চালাবেন, আর নাগরিক পার্টি এবার রাস্তায় নামবেন। তবে আপাতত ঠিক হয়েছে, সমাজমাধ্যমকে ব্যবহার করে সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে জনমানসে ক্ষোভ তৈরি করা হবে। জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের চরিত্রহনন করতে সেনাবাহিনীতে থাকা কট্টর মুসলিম মৌলবাদী জওয়ান ও আধিকারিকদের সংগঠিত করা হবে। ঠিক যেমনটা হয়েছিল গত বছরের জুন জুলাইয়ের তথাকথিত বিপ্লবের সময়। সামনে যেহেতু ঈদ, তাই ওই উৎসবকে কাজে লাগিয়ে আলেম-ওলেমাদেরও সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে পথে নামানো হবে। প্রথম দাবি হবে, সেনা অবিলম্বে ব্যারাকে ফিরতে হবে। দ্বিতীয় দাবি হবে, হাসিনা জমানায় খুন-গুমে জড়িত সেনা আধিকারিকদের বিচার। এভাবেই জেনারেল ওয়াকারকে চাপে ফেলার কৌশল নেওয়া হয়েছে। আর এই ষড়যন্ত্র থেকে নজর ঘোরাতেই মুহাম্মদ ইউনূসের পদত্যাগের ইচ্ছাপ্রকাশের বিষয়টি রটিয়ে দেওয়া হল। আদৌ তিনি তা করবেন কিনা সেটাই এখন দেখার।












Discussion about this post