জুলাই মাসের শুরুতেই ঘোষিত হতে পারে জুলাই ঘোষণাপত্র। এই ঘোষণায় সংবিধান পরিবর্তনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। আবার এর অংশ হিসেবে সংবিধান স্থগিত ঘোষণাও হতে পারে। একই সাথে সরকারের উচ্চপর্যায়ে পরিবর্তন ঘটানো হতে পারে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও কূটনৈতিক স্তরের বিভিন্ন সূত্রের দাবি, দ্রুততার সঙ্গে সেই কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে মুহাম্মদ ইউনূস সরকার। যে কোনও সময় তা ঘোষণা করা হতে পারে। ওই সুত্রগুলির আরও দাবি, বর্তমান সংবিধান বহুমাত্রিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বাঁধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এই সংবিধানের কাঠামোর মধ্যে বিপ্লব-উত্তর সরকার কাজ করতে পারছে না। যেমন বাংলাদেশের সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্যদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, গত বছর ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার বিদায়ের পরই এই সংবিধান স্থগিত করা প্রয়োজন ছিল। সেটাই ছিল মোক্ষম সময়। কিন্তু তা না করতে পারায় এখন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। তাঁরা যদিও মনে করছেন, তবে জনগণের সর্বোচ্চ অভিপ্রায়ের ক্ষমতা সবসময় থাকে। আপাত দৃষ্টিতে সংবিধান স্থগিত করে জাতীয় ঐকমত্যের সরকার গঠন করা কঠিন মনে হলেও বৃহত্তর জনগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তা হতেই পারে। আর সেই চেষ্টাতেই রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি এবং ইউনূস সরকারের একটা বড় অংশ। তাঁদের পিছন থেকে সমর্থন করছে জামাতের মতো কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলি।
জুলাই সনদ ঘোষণা হলে বাংলাদেশে কি কি পরিবর্তন হতে পারে, তা নিয়ে নানান তথ্য সামনে আসছে। যেমন একটি সুত্র বলছে, বর্তমান সংবিধান স্থগিত করা হলে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের অনুরোধ জানানো হতে পারে। সেক্ষেত্রে উপদেষ্টা পরিষদ ভেঙে দিয়ে নতুন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। যার মাথায় অর্থাৎ প্রধান উপদেষ্টা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ভাবা হচ্ছে। জামাতের আমীর শফিকুর রহমান উপ প্রধান উপদেষ্টা। তখন জাতীয় নাগরিক পার্টি-সহ বিরোধী কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের উপদেষ্টা হিসেবে বাছাই করা হতে পারে। যাতে একটা ঐক্যমত সৃষ্টি করা যায়। আবার আরেকটি সূত্র বলছে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে সরিয়ে তাঁর জায়গায় আনা হতে পারে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে। সে ক্ষেত্রে উপ প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানকে করা হবে। অন্যান্য উপদেষ্টা হিসেবে বিএনপি-জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা স্থান পাবেন। বর্তমান উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেই বাদ যাবেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে এই ধরণের জাতীয় সরকার দায়িত্ব নিলে নতুন সংবিধান প্রণয়নের বিষয়টি অগ্রাধিকার পাবে। তখন জাতীয় নির্বাচন আরও পিছিয়ে দিতেও অসুবিধা হবে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অন্য একটি সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ বা ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক শক্তিকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করাই হল মূল উদ্দেশ্য। দেশে বড় ধরনের নাশকতা ও অস্থিরতা ঘটানোর ষড়যন্ত্রের গোয়েন্দা তথ্য বিবেচনা করার আছিলায় আওয়ামী লীগ হঠানোর চক্রান্ত রচনা করতেই বর্তমান সংবিধান স্থগিত ও জাতীয় সরকার গঠনের বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।
সবদিক বিচার করলে একটা বিষয়ই সামনে আসে, এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যা যা ঘটছে বা ঘটানোর চেষ্টা হচ্ছে তার প্রায় সবটাই আওয়ামী লীগকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার উদ্দেশ্য নিয়ে। বাহাত্তরের সংবিধানকে কবর দেওয়ার ডাক কে বা কারা দিয়েছিল তা বাংলাদেশবাসী জানেন। কেন সেই সংবিধান কবর দেওয়ার ডাক দেওয়া হয়েছিল তাও সকলে জানেন। আসলে বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৫২ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতিকে তখনই সরানো যায় যখন সংসদে তাঁর বিরুদ্ধে ইমপিচমেন্ট পাস করানো হবে। কিন্তু শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালানোর পরই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু দেশের সংসদ ভেঙে দিয়েছিলেন। ফলে সেটা আর সম্ভব নয়। তাই বিকল্প পথ হিসেবে, দ্রুত জুলাই সনদ ঘোষণা করে, সংবিধানকে বাতিল করা। তারপরই রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে সরিয়ে নতুন রাষ্ট্রপতি নিয়োগ ও উপদেষ্টা মণ্ডলীতে রদবদল করে একটা জাতীয় সরকার গঠন করা। আর সেটা করার অন্যতম কারণ হিসেবে বৃহত্তর জনগণের আকাঙ্খাকে তুলে ধরা। অন্যদিকে ভারতে নির্বাসনে থেকেও শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আভাস দিচ্ছেন তিনি চট করে বাংলাদেশে ফিরবেন। এ অবস্থা চলতে পারে না। যা ছাত্রনেতা থেকে শুরু করে ইউনূস সরকারের অনেকেরই মাথাব্যাথার কারণ। ফলে জুলাই সনদ ঘোষণা করে দ্রুত বাংলাদেশের সংবিধান পাল্টে ফেলা।












Discussion about this post