বাংলাদেশ কী ক্রমশ জঙ্গিরাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে? আন্তর্জাতিক মঞ্চে এই প্রশ্ন ইতিমধ্যেই ঘোরাফেরা করতে শুরু করেছে। কারণ, সম্প্রতি জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে ৩৬ জন বাংলাদেশি নাগরিককে গ্রেফতার করেছে মালয়েশিয়া পুলিশ। এখানেই শেষ নয়, ক্রমাগত সাংবাদিক সম্মেলন করে মালয়েশিয়ার পুলিশপ্রধান খালিদ ইসমাইল বিভিন্ন তথ্য দিয়ে চলেছেন ধৃত বাংলাদেশিদের সম্পর্কে। অবশ্য তা নিয়ে নতুন বাংলাদেশের অন্তরবর্তী সরকারের কোনও তাপ উত্তাপ নেই। বরং সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী দাবি করেছেন, বাংলাদেশে কোনও জঙ্গি নাই। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, দায় অস্বীকার করে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার জঙ্গি সংশর্ব লুকোতে চাইছে।
গত বছর ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন হওয়ার পর বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসেন মুহাম্মদ ইউনূস। যে গণ অভ্যেউত্থানের জেরে বাংলাদেশে পালাবদল হয়েছে, সেটা যে স্বতঃস্ফূর্ত নয়, সেটাও এখন স্পষ্ট। বিদেশী রাষ্ট্রের আর্থিক সাহায্য এবং মদতে এই অভ্যাউত্থান সৃষ্টি করা হয়েছিল শেখ হাসিনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর উদ্দেশ্যে। মার্কিন ডিপ স্টেট, ইউরোপীয়ো কয়েকটি দেশ এবং পাকিস্তানের আইএসআই এই পালাবদলের নেপথ্যে রয়েছে। যারা এখনও কিছু স্বার্থের জন্য বাংলাদেশকে অশান্ত রাখতে চায়। মুহাম্মদ ইউনূস তাঁদেরই হাতের পুলুল মাত্র। ফলে তিনি ক্ষমতায় এসেই বাংলাদেশের জেল থেকে শতাধিক শীর্ষ জঙ্গি নেতাকে ছেড়ে দিয়েছিলেন। পাশাপাশি গত বছর জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে ব্যপক অরাজকতা এবং বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে একাধিক জেল ভেঙে পালিয়েছিল প্রায় ৭০০ জনের বেশি ভয়ানক অপরাধী। পলাতকদের মধ্যে ৮০ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, ৭৮ জন জঙ্গি রয়েছে। তাঁরা এখনও ধরা-ছোঁয়ার বাইরে। এছাড়া, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের দিন দায়িত্বরত স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স বা এসএসএফ সদস্যরা নির্দিষ্ট ভল্টে তাঁদের অস্ত্র জমা রেখে গণভবন ছেড়ে চলে যান। পরে অভ্যুত্থানকারীরা গণভবনে ঢুকে ব্যাপক লুটপাটের সময় ওই ভল্টে রাখা ৩২টি অত্যাধুনিক অস্ত্রও লুট করে নিয়ে যায়। যার সন্ধান এখনও পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় বিভিন্ন থানা, কারাগার ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ হাজার ৮২৯টি অস্ত্র এবং ৬ লক্ষ ৬ হাজার ৭৪২টি তাজা কার্তুজ লুট হয়৷ এর মধ্যে ১ হাজার ৫৪৬টি আগ্নেয়াস্ত্র, ২ লক্ষ ৬২ হাজার গোলাবারুদ আজও উদ্ধার করা যায়নি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের বক্তব্য, মুহাম্মদ ইউনূস সরকারই জঙ্গি ও জিহাদিদের দ্বারাই ক্ষমতায় এসেছে, তাই শীর্ষ জঙ্গিনেতাদের জেল থেখে ছেড়ে দিতে সরকার বাধ্য হয়েছে। সেই কারণেই ইউনূস সরকার জেল ভেঙে পালানো জঙ্গি বা অপরাধীদের ধরার বিন্দুমাত্র চেষ্টা করেনি। এমনকি লুঠ হওয়া অস্ত্রশস্ত্রও উদ্ধারের কোনও চেষ্টা দেখা যায়নি। এর ফলই ভুগতে হচ্ছে বাংলাদেশকে। মালয়েশিয়ার পুলিশপ্রধান খালিদ ইসমাইল জানিয়েছেন, আটক ৩৬ বাংলাদেশি শ্রমিকের মধ্যে ৫ জনের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী সংগঠনের সদস্য হওয়ার অভিযোগে মামলা হয়েছে। ১৫ জনকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে। বাকি ১৬ জন এখনও পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। অপরদিকে বাংলাদেশের আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানিয়েছেন, মালয়েশিয়ায় জঙ্গিবাদের সঙ্গে জড়িত অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া বাংলাদেশি শ্রমিকদের মধ্যে তিনজন ইতিমধ্যে দেশে ফেরত এসেছে। তাঁদের তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গির আলম চৌধুরী অবশ্য কোনও বাংলাদেশির জঙ্গিবাদে জড়িত থাকার অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, মালয়েশিয়া সরকার আমাদের সেরকম কিছু জানায়নি। বাংলাদেশে কোনও আইএস জঙ্গি নেই।
মালয়েশিয়ায় ধৃত বাংলাদেশী জঙ্গিদের নিয়ে ইউনূস সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও আইন উপদেষ্টার মধ্যে মতপার্থক্য এটাই প্রমান করে যে কিছু একটা লুকোনোর চেষ্টা করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। যে সরকার আন্তর্জাতিকভাবে ঘোষিত জঙ্গিদের জেল থেকে ছেড়ে দিতে পারে, তাঁরা যে জঙ্গিবাদকে সমর্থন করছে এটা পরিস্কার। পাশাপাশি বিগত ১০ মাসে বাংলাদেশে বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠন ঢাকার রাস্তায় প্রকাশ্যে মার্চ ফর খিলাফৎ আয়োজন করেছে, হাত গুটিয়ে বসে ছিল পুলিশ ও সেনাবাহিনী। এখন মালয়েশিয়া সরকারের দাবিকেও অস্বীকার করছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউনূস সরকার যে দাবিই করুক না কেন, আন্তর্জাতিক মহল সব দেখছে। যার ফল ভুগতে হবে বাংলাদেশকেই।












Discussion about this post