পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের ভিনরাজ্যে হেনস্থা হতে হচ্ছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ডাকে বুধবার বড় মিছিল ও সমাবেশও হল এর প্রতিবাদে। কিন্তু কখনও ভেবেছেন কি, কারা কেন কোন পরিস্থিতিতে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিনরাজ্যে কাজে যাচ্ছেন? পরিযায়ী শ্রমিকের সংখ্যাই বা কত? রাজ্যে যদি কাজ না থাকে, তাহলে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবেই অন্যান্য রাজ্যে কাজের খোঁজে যেতে হয়। এটা গর্বের নাকি লজ্জার?
বাইরের রাজ্যে বাংলায় কথা বললেই হেনস্তার শিকার হচ্ছেন এই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকরা। রাজ্যের শাসকদলের বক্তব্য, ভিনরাজ্যে, মূলত বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতেই বেশি হেনস্থা করা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকদের। যার প্রতিবাদে বুধবার বৃষ্টি মাথায় করে রাস্তায় নামলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এদিনের মিছিলে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ আরও অনেক শীর্ষ নেতা। মিছিল শেষে ডোরিনা ক্রসিংয়ের মঞ্চ থেকে মমতার হুঁশিয়ারি, “আরও বাংলায় কথা বলব। ক্ষমতা থাকলে আমাকে ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখুন”। তাঁর আরও হুঁশিয়ারি, বাংলায় যেমন অবাঙালিদের ওপর কোনও অত্যাচার হয় না, তেমনই ভিনরাজ্যে বাঙালিদের ওপর অত্যাচার মেনে নেওয়া হবে না।
এমনকি বিজেপির উদ্দেশেও এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আগামী দিন ভয়ঙ্কর। তোমরা নিজেরা থাকবে কি না ক্ষমতায়, আগে সেটা বিচার করো। তার পরে বাঙালিকো মারো”। অর্থাৎ, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের সুর জন্য সুর চড়াতে শুরু করেছেন তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিরোধীদের বক্তব্য, যে পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য তাঁর এত কান্না তাঁদের কেন ভিন রাজ্যে কর্মসংস্থানের জন্য ছুঁটতে হচ্ছে। কারা যাচ্ছেন, কেন যাচ্ছেন আর কতজন বাঙালি শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজ করেন? এই প্রশ্নগুলিও উঠছে। আসুন একবার এই পরিসংখ্যানে চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। পশ্চিমবঙ্গ সরকার করোনাকালের পর পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য একটি পোর্টাল চালু করেছিল। সেই পোর্টাল অনুযায়ী এখনও পর্যন্ত প্রায় ২২ লক্ষ শ্রমিক এতে নাম লিখিয়েছেন। কিন্তু ওয়াকিবহাল মহল এবং শাসকদল তৃণমূলের তরফেই বিভিন্ন সময়ে দাবি করা তথ্য অনুযায়ী এই সংখ্যা আরও কয়েকগুণ বেশি। কেউ কেউ বলেন, পশ্চিমবঙ্গ থেকে নাকি ৫০-৬- লক্ষের বেশি শ্রমিক ভিনরাজ্যে কাজের সন্ধানে গিয়েছেন। এটা নিশ্চই রাজ্যের জন্য গর্বের বিষয় হতে পারে না। তবুও শাসকদলের দলের নেতারা বিভিন্ন সময় ভিনরাজ্যে বাংলার শ্রমিকদের হেনস্থা নিয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে এমনটাই দাবি করেন।
রাজ্যের কতজন পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজ্যছাড়া হচ্ছেন, সেটা নিয়ে গর্বের শেষ নেই তৃণমূল নেতাদের মধ্যে। একটা পরিসংখ্যানই যথেষ্ট পরিযায়ী শ্রমিকদের বর্ণ ও জাতি নিয়ে আলোচনা করার জন্য। যেমন পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি পরিযায়ী শ্রমিক যে জেলা থেকে ভিন রা্জ্যে যান, সেই জেলার নাম মুর্শিদাবাদ, সংখ্যাটা হল প্রায় ১২ লক্ষ। এরপরের স্থান মালদা। এই জেলা থেকে প্রায় ১০ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে পারি জমান বলেই খবর। ফলে এই দুটি জেলা নিয়েই ২২ লক্ষ হয়ে যায়। ফলে বোঝাই যাচ্ছে, আরও কয়েক লক্ষ শ্রমিক এই রাজ্য থেকে ভিন রাজ্যে পারি দেন শ্রমিকের কাজ করতে। যেমন, উত্তর দিনাজপুরে সাড়ে আট লক্ষ, দক্ষিণ দিনাজপুরে সাড়ে চার লক্ষের কাছাকাছি। আবার বীরভূম থেকে প্রায় সাত লক্ষ, নদিয়া থেকে পাঁচ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক ভিনরাজ্যে যান প্রতিবছর। পাশাপাশি দক্ষিণ ২৪ পরগণা এবং উত্তর ২৪ পরগণা জেলা থেকে প্রায় আট লক্ষ শ্রমিক অন্যান্য রাজ্যে কাজের সন্ধানে যান। একটু লক্ষ্য করলেই বোঝা যাবে, এই জেলাগুলি মূলত মুসলিম প্রধান। বিরোধীদের দাবি, এই রাজ্য থেকে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে ভিন রাজ্যে কাজের সন্ধানে যাওয়া সিংহভাগই মুসলিম। অর্থাৎ, মুসলিমদের জন্য রাজ্য সরকার গলা ফাটিয়ে দিলেও তাঁরা এখানে কাজ পান না। এই পরিসংখ্যানই তার প্রমান।
এবার আসা যাক কোন কোন রাজ্য থেকে মূলত বাঙালিদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠছে। প্রথমেই নাম আসছে দিল্লির। কিন্তু যেখানে মূল অভিযোগ, সেটা হল দিল্লির জয় হিন্দ কলোনী। জানা যায়, জয় হিন্দ কলোনী যেখানে গড়ে উঠেছে, সেটা দখলীকৃত এলাকা। আদালতের নির্দেশে তা খালি করার জন্যই কাজ করছে স্থানীয় প্রশাসন। ফলে এ ক্ষেত্রে বাঙলা ভাষায় কথা বলার জন্য অত্যাচারের প্রসঙ্গ খাটে না। অন্যদিকে, বাম শাসিত কেরল, এম কে স্টালিনের তামিলনাড়ু ও আপ শাসিত পঞ্জাব। যা মূলত তৃণমূল কংগ্রেসের মতোই ইন্ডি জোটের সদস্য। আর বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলির মধ্যে মহারাষ্ট্র, গুজরাট, ওড়িশা এবং আসাম নিয়েও অভিযোগ রয়েছে তৃণমূলের। ওয়াকিবহাল মহলের প্রশ্ন, এ ক্ষেত্রে বিজেপি এবং অবিজেপি শাসিত রাজ্য সব জায়গা থেকেই বাঙালি শ্রমিকদের হেনস্থার অভিযোগ আছে। আর এটা হচ্ছে মূলত অবৈধ বাংলাদেশিদের চিহ্নিত করতে গিয়ে। আরও অভিযোগ, বেশিরভাগ অবৈধ বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের আধার, ভোটার কার্ড বা প্যান কার্ডের মতো পরিচয়পত্র এই বাংলা থেকে হয়েছে। তাঁরা ধরাও পড়ছেন। তাহলে কেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তাঁদের হয়ে গলা ফাটাচ্ছেন? আসলে এই মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিকদের একটা বড় অংশই তৃণমূলকে ভোট দেন। তাই তাঁদের হয়ে মহানগরে মিছিল করছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু একবারও বলছেন, এই লক্ষ লক্ষ শ্রমিক কেন ভিন রাজ্যে রুটি রুজির সন্ধানে যাবেন। কেনই বা তাঁরা এই রাজ্যেই কাজ পাবেন না। এটা দ্বিচারিতা ছাড়া আর কি বলা যায় প্রশ্ন বিজেপির। তাঁদের দাবি, বিহারের মতো এবার পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন হবে। যতই মুখ্যমন্ত্রী মিছিল-মিটিং করুন না কেন। আসল খেলা ছাব্বিশের ভোটে।












Discussion about this post