গালওয়ান পর্ব অতীত। দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চিন সফরে গেলেন। এই পাঁচ বছরে ভারত ও চিনের সম্পর্ক ছিল “কভি খুশি-কভি গম” সিনেমার মতো। এই মুহূর্তে ভূ-রাজনীতি এমন একটি অবস্থায় আছে, যেখানে দাঁড়িয়ে বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের এই চিন সফর অনেক দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। মঙ্গলবারই বেজিংয়ে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। কিন্তু ভারতের বিরোধী দলনেতা তথা কংগ্রেস সুপ্রিম রাহুল গান্ধির মোটেই তা পছন্দ হয়নি। তিনি সটান এক্স হ্যাঁন্ডেলে লিখে দিলেন ‘বিদেশমন্ত্রী সার্কাস দেখাচ্ছেন’। ফলে স্বভাবতই প্রশ্ন উঠছে, রাহুল গান্ধিকো গুসসা কিউ আতা হ্যায়?
এই প্রসঙ্গে কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশের বক্তব্য থেকে রাহুল গান্ধির ক্ষোভ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা করা যায়। রমেশের ‘রেয়ার আর্থ ম্যাগনেট ও টানেল-বোরিং যন্ত্রের মতো পণ্য রপ্তানিও কমিয়ে দিয়েছে চিন। এর পরিস্থিতিতে চিনের সঙ্গে বৈঠকের উদ্দেশ্য কী?’ তবে রাহুল গান্ধি বা কংগ্রেস নেতারা যাই বলুক কূটনৈতিক মহলে ভারত-চিন নয়া সমীকরণ নিয়ে অন্য মতবাদ চলছে। কারণ, বেজিংয়ে জয়শঙ্কর ও শি জিনপিংয়ের বৈঠক। বিগত পাঁচ বছরে ভারত ও চিনের মধ্যে দ্বীপাক্ষিক কোনও বৈঠক হয়নি। বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এমন একটা সময় চিন সফর করছেন যখন দুই দেশ একটা অদ্ভুত পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে। সেটা হল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ট্যারিফ যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধে বেজিং যতটা ব্যাকফুটে, নয়া দিল্লি ততটাই ফ্রন্টফুটে। ট্রাম্পের চাপে যেখানে বেজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তিতে সম্মত হয়েছে সেখানে নয়া দিল্লি এখনও কোনও বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করেনি। রাশিয়ার থেকে তেল কেনা নিয়ে ভারতকে ক্রমাগত হুঁশিয়ারি দিয়ে চলেছে ওয়াশিংটন, ভারত তেল কেনা কমানো তো দুর অস্ত উল্টে বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে ট্যারিফ যুদ্ধে পাল্টা মারের পথ দেখিয়ে দিয়েছে ভারত। এই পরিস্থিতিতে চিনও চাইছে ভারতের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ওপেন চ্যালেঞ্জ দিতে। বিদেশ মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর চিনা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে নিশ্চয়ই এই বিষয়ে আলোচনা সেরেছেন এক দফা। আগামী মাসেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চিন সফরে যাবেন, তার আগে বিদেশমন্ত্রী উপযুক্ত প্লাটফর্ম তৈরি করে আসবেন এ কথা বলাই বাহুল্য।
কূটনৈতিক মহলের মতে, এস জয়শঙ্কর এবারের চিন সফরে দুটি তাস হাতে নিয়ে গিয়েছেন। একটি তিব্বত অন্যটি তাইওয়ান। যা দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় নিজেদের অবস্থান অটুট রাখতে নয়াদিল্লিকে সাহায্য করবে বলেই মত কূটনৈতিক মহলের। তিব্বতি ধর্মগুরু দলাই লামাকে নিয়ে এই মুহূর্তে সরগরম দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক। ভারত যেমন স্পষ্ট করে দিয়েছে পরবর্তী দলাই লামা ভারত থেকেই নির্বাচিত হবেন, একইভাবে চিন দাবী পঞ্চদশ দলাই লামা নির্বাচিত হবেন চিন থেকে। কিন্তু গত মাসে চিনের রাজধানী বেজিংয়ে এসসিও সম্মেলনের যোগ দিতে গিয়ে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং ও ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভাল স্পষ্ট করে এসেছেন এবার দুই দেশের মধ্যে স্থায়ী সীমান্ত নির্ধারণ করা জরুরী। অপরদিকে ভারতের চিন সীমান্ত লাখোয়া রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রী বারবার দাবি করছেন ভারতের সঙ্গে চিনের সেভাবে কোনও সীমান্তই নেই। ভারত তিব্বতের সঙ্গে সীমান্ত ভাগ করে নেয়। এর অর্থ হল ভারত তিব্বতের সার্বভৌমত্ব দাবী করছে এবং তিব্বতি ধর্মগুরু দলাই লামার নির্বাচন ভারতই করবে। ভারত চীন সীমান্ত বিবাদ মেটে কিনা সেটা সময় বলবে, কিন্তু ভারতের এই অগ্রাসী মনোভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্কযুদ্ধ দুইয়ে মিলে প্রবল চাপে থাকা বেজিং কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত। এই আবহেই ভারত তাইওয়ান এর সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও মজবুত করছে এবং নতুন প্রতিরক্ষা সমঝোতাও করতে চলেছে বলেই কূটনৈতিক মহলের খবর। এটা অবশ্যই চিনকে চাপে রাখার আরও একটি পন্থা। এক সময় সকল কূটনৈতিক এস জয়শঙ্কর এখন ভারতের বিদেশমন্ত্রী। তাই তিনি বিলক্ষন জানেন এই ধরনের পরিস্থিতিতে কিভাবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক থেকে ফায়দা তুলতে হয়। ফলে রেয়ার আর্থ মিনারেলস বা অন্যান্য জটিল যন্ত্রপাতি রফতানি পুনরায় চালু করা এবং ভারত ও চিনের মধ্যে সরাসরি বিমান পরিষেবা চালুর ব্যাপারেও জয়শঙ্কর চাপ দেবেন। এক মাস পর নরেন্দ্র মোদি বেজিং সফরে যাবেন, তাঁর বৈঠক করার কথা শিজিনপিংয়ের সঙ্গে। এটাই মেনে নিতে পারছেন না বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধি। কারণ ২০২৪ সালে চিন প্রবলভাবে চেষ্টা করেছিল কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধি যাতে ক্ষমতায় আসে। কিন্তু কোনওটাই হয়নি। তাই চিনও এখন কংগ্রেস নেতৃত্বের থেকে দূরে সরছে। অন্যদিকে পাকিস্তানও চিনকে দূরে রেখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রর সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করতে চাইছে। চিনা ফাইটার জেটের বদলে মার্কিন এফ-১৬ কিনতে চলেছে ইসলামবাদ। যা চিনের কাছে প্রবল ধাক্কার সামিল। এই পরিস্থিতিতে কোনঠাসা বেজিংয়ের দিকে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে নয়া দিল্লি দুর্দান্ত কূটনৈতিক চাল দিল। লক্ষ্য একটাই, চিন থেকে রেয়ার আর্থ মিনারেলস আমদানি বাড়ানো এবং সীমান্ত বিবাদ কিছুটা কমিয়ে আনা। এটাই রাহুল গান্ধির রাগের কারণ












Discussion about this post