প্রায় এক বছর আগে ৫ আগস্ট বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থানের পর এক অদ্ভুত পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে আসেন বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে। গণভবন লুটপাট হয়, ভাঙচুর হয়। গোটা দেশ তখন শাসকবিহীন এক অরাজক পরিস্থিতিতে। সেই সময় বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, আপনারা আশাহত হবেন না, দেশের দায়িত্ব আমার কাঁধে। দেশের সশস্ত্রবাহিনীর ওপর আস্থা রাখুন।
এরপর পদ্মা ও যমুনা দিয়ে বয়ে গিয়েছে অনেক জল। বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে গিয়েছে। মব জাস্টিসের নামে যেখানে সেখানে গণধোলাই। সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর অকথ্য নির্যাতন, খুন। দিনে-দুপুরে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ওপর অত্যাচার, খুন, তাঁদের বাড়িঘর লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের হেনস্থা, ৩২ নম্বর ধানমন্ডির ঐতিহ্যবাহী বাড়ি, হাসিনার বাড়ি কোনও কিছুই বাদ যায়নি ভাঙার। কিন্তু সেনাপ্রধান ও সেনাবাহিনী যেন ঘুমিয়ে ছিলেন। তবুও বাংলাদেশের আম জনতা আশাবাদী ছিলেন, সেনাপ্রধানই পারবেন এই পরিস্থিতি থেকে তাঁদের উদ্ধার করতে। সোশ্যাল মিডিয়া ও অন্যান্য মাধ্যমে সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশই জেনারেল ওয়াকার উজ জমানকেই রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখতে চেয়েছেন বারবার। অথচ তিনি মাঝে মধ্যে ঘুম ভেঙে ওঠেন, একটু আধটু হুংকার দেন আবার শীতঘুমে চলে যান। যেমন মাস পাঁচেক আগে ওয়াকার উজ জামানের হুংকার কাঁপিয়ে দিয়েছিল প্রধান উপদেষ্টার বুক। এক অনুষ্ঠানে তিনি কার্যত হুঁশিয়ারির সুরে বলেন, আমি আপনাদের সতর্ক করে দিচ্ছি, কাদা-ছোড়াছুড়ি করলে দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হবে।
বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের সেই হুঁশিয়ারির পর কেটে গিয়েছে আরও পাঁচ মাস। কিন্তু সেনাবাহিনী কি নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে পেরেছে? উল্টে আমরা দেখেছি, সদ্য গঠন হওয়া রাজনৈতিক দল এনসিপির দুই নেতা হাসনাত ও আসিফ সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ আনলেন। সেনাপ্রধানও একের পর এক বৈঠক করলেন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। যার ফলাফল শূন্য। বর্তমানে বাংলাদেশের মানুষ ধীরে ধীরে বুঝতে পারছেন জেনারেল ওয়াকার আসলে দু-নৌকায় পা দিয়ে চলতে চাইছেন। তিনি যেমন মুহাম্মদ ইউনূসের এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে চটাতে চাইছেন না। আবার বাংলাদেশের মানুষের কাছে আস্থাও হারাতে চাইছেন না। তাই মাঝেমধ্যে ফোঁস করেন দেশের অরাজক পরিস্থিতি সম্পর্কে। আবার চুপ করে যান। এই চালাকি ধরে ফেলেছেন বাংলাদেশের আম জনতা। তাই সেনাবাহিনীর প্রতি বিক্ষোভ বাড়ছে দিকে দিকে। এই বিক্ষোভে ঘৃতাহুতি দিয়েছে দুটি ঘটনা। প্রথমটি গত ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগ ও গ্রামবাসীদের উপর সেনাবাহিনীর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ। আর দ্বিতীয়টি বল ২১ জুলাই ঢাকায় মাইলস্টোন স্কুলে যুদ্ধবিমান ভেঙে পড়ার পরদিন বিক্ষোভরত ছাত্রদের ওপর সেনাবাহিনীর লাঠিপেটা। এরপর বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে একাধিক বিক্ষোভ হয়েছে। সবমিলিয়ে এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যেমন এনসিপি নেতৃত্ব ও মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হচ্ছে, তেমনই সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের বিরুদ্ধেও ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। যা মোটেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য স্বাস্থকর নয়। জানা যাচ্ছে সেনাবাহিনীরও যে অংশটি জেনারেল ওয়াকারকে সমর্থন করছিলেন, তাঁরাও চরম ক্ষুব্ধ। যে কোনও সময় এই ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে পারে।












Discussion about this post