সম্প্রতি ‘বাঙালি অস্মিতা’ ইস্যুতে ভারতীয় জনতা পার্টির উপর আক্রমণ আরও তীব্র করছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সব বাঙালিই বাংলা ভাষায় কথা বলেন, কিন্তু সব বাঙালিই যে পশ্চিমবঙ্গের নাগরিক নন, সেটা খুব ভালো করেই জানেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কে অবনতি হওয়ার পর থেকেই ভারত সরকার এ দেশে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করার নির্দেশ দিয়েছিল প্রতিটি রাজ্যকে। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারের সেই নির্দেশ পেয়েই অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে শুরু করে বিভিন্ন রাজ্য সরকার। বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলি এই কাজ জোরকদমে শুরু করে। অন্যদিকে পশ্চিমবঙ্গ এই কাজ শুরুই করেনি। আবার এই রাজ্য থেকে লক্ষ লক্ষ পরিযায়ী শ্রমিক দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন। তাঁদের সঙ্গে মিশে আছে অবৈধ বাংলাদেশিরাও। যাদের ভাষা এক ও ধর্মও এক। গোলমাল এখানেই। বিভিন্ন রাজ্য থেকে অভিযোগ আসতে শুরু করল, অবৈধ বাংলাদেশি খুঁজতে গিয়ে এই রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের আটক করা হচ্ছে, তাঁদের হেনস্থা করা হচ্ছে। সরব হন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু যখনই জাতীয় নির্বাচন কমিশন বিহারের মতো পশ্চিমবঙ্গেও ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধনী চালু করতে উদ্যোগী হল, তখনই খেলা গেল ঘুরে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তীব্র আন্দোলনে নেমে পড়লেন বাংলাভাষীদের হেনস্থা নিয়ে। মজার ব্যাপার হল, বাংলাভাষী মানেই কিন্তু পশ্চিমবঙ্গবাসী নয়। সেখানেই বাংলাদেশিরাও রয়েছেন। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি অবৈধ বাংলাদেশিদের পাশে দাঁড়াতে পারবেন না। তাই তিনি বাংলা ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়ে বসলেন। আচমকা কেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর এ হেন সিদ্ধান্ত? তিনি কি কোনও ফাঁদে পড়লেন? এর পিছনে কি আন্তর্জাতিক কোনও চক্রান্ত আছে? বাংলার রাজনৈতিক মহলে এখন এটাই মূল চর্চার বিষয়।
বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার জন্য একসময় আন্দোলন করেছিলেন বাংলাদেশের মানুষ। মাতৃভাষা রক্ষার সেই আন্দোলন আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃত। সেরকমই এক ভাষা আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে বাংলাভাষীদের উপর আক্রমণ এবং অভিবাসীদের আটকের প্রতিবাদে এই “ভাষা আন্দোলন” বলে দাবি করেছেন তিনি। আর এর একটি নতুন নামকরণও করেছেন তিনি, “ভাষা সন্ত্রাসবাদ”। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের মঞ্চ তৈরি করছেন তৃণমূল নেত্রী। কিন্তু গত ২৬ জুলাই একটি ট্যুইট করেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে তিনি লেখেন, বাংলার বাইরে বাঙালি ‘হেনস্তা’র অভিযোগের রেশ আছড়ে পড়েছে আন্তর্জাতিক মহলে। তাঁর দাবি, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করল নিউ ইয়র্কের এক মানবাধিকার সংস্থা। মুখ্যমন্ত্রীর ট্যুইটে নিউ ইয়র্কের স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের এশিয়ার কর্ণধার এলায়েন পিয়ারসনের একটি রিপোর্টের উল্লেখ করেছেন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, বিজেপি বাঙালিদের দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে। অবৈধভাবে বসবাসকারী নামে যে কোনও নাগরিককে হেনস্তা চলছে। রিপোর্টটিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে বিজেপি শাসিত অসম, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, ওড়িশায় এমন ঘটনা বেশি ঘটছে। এমনকি তিনি এটাকে চরম লজ্জারও বলে উল্লেখ করেছেন।
অভিযোগ, এই নিউইয়র্ক ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ আসলে মার্কিন ডিপ স্টেটের অংশ জর্জ সোরসের সংস্থা ওপেন ফাউন্ডেশের ছায়া সংগঠন। কয়েকটি আন্তর্জাতিক মিডিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হিউম্যান রাইটস ওয়াচকে সম্প্রতি নতুন করে ১০০ মিলিয়ন অনুদান দিয়েছে জর্জ সোরসের সংস্থা। প্রসঙ্গত, মার্কিন ডিপ স্টেট, জর্জ সোরসের ওপেন ফাউন্ডেশনের অর্থেই বাংলাদেশে রাজনৈতিক পালাবদল হয়েছে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট। আচমকা নিউইয়র্ক ভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের রিপোর্ট নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ট্যুইট কেন? উঠছে প্রশ্ন। অন্যদিকে তৃণমূলের আরেক নেত্রী তথা নদিয়া জেলার কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র আবার দাবি করে বসেছেন, কেউ ভারতবর্ষে থাকতে চায় না। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা নাকি ভারতের থেকে ভালো।
বাইট – মহুয়া মৈত্র, তৃণমূল সাংসদ
অন্যদিকে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতোই এক সুর শোনা গেল বাংলাদেশের সাবেক উপদেষ্টা বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের গলায়। তিনি ত্রিপুরা ও আসাম সীমান্তবর্তী মৌলভীবাজারে এক জনসভায় সরাসরি নরেন্দ্র মোদিকে আক্রমণ করলেন বাংলাভাষীদের উপর জোরজলুম নিয়ে। তাঁর দাবি, আসামের মুসলমানদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকে পরিণত করেছেন নরেন্দ্র মোদি।
রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, বাঙালি আস্মিতার প্রশ্নে তৃণমূল আন্তর্জাতিক কোনও চক্রান্তের ফাঁদে পা দিয়ে ফেলছে না তো? বাংলাভাষী মাত্রই যে শুধু এই বঙ্গের বাসিন্দা নয়, দুই বাংলার মানুষই বাংলাভাষায় কথা বলেন। আবার আসাম, ত্রিপুরার মতো বিজেপি শাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর হেনস্থার অভিযোগ আসছে দুই দেশের রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকেই। একদিকে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যেমন সরব, তেমনই ওপার বাংলার এনসিপি নেতা নাহিদ ইসলামও সরব। নেপথ্যে আন্তর্জাতিক খেলোয়াড় মুহাম্মদ ইউনূস কোনও কলকাঠি নাড়ছেন না তো? তাহলেই সমূহ বিপদ।












Discussion about this post