চলতি মাসের শেষের দিকে হিন্দুদের সবচেয়ে বড় উৎসব দুর্গাপূজা। বাংলাদেশে কমবেশি কয়েক হাজার দুর্গাপূজা হয়। এরমধ্যে রাজধানী ঢাকায় সবচেয়ে বেশি। কয়েকটি আবার ঐতিহ্যবাহী ও আড়ম্বরপূর্ণ। শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশের দুর্গোৎসবে বেশ রমরমা হয়েছিল। সে দেশে হিন্দুরা সংখ্যালঘু, তবুও পুজো, উৎসব পালন করতে তাঁদের খুব একটা সমস্যা হয়নি শেখ হাসিনার আমলে। কিন্তু গত বছর ৫ আগষ্টের পর থেকে পরিস্থিতি পাল্টেছে বাংলাদেশে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে এক তদারকি সরকার ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু এই সরকারের চালিকাশক্তি জামাতের মতো কট্টরপন্থী মৌলবাদী সংগঠনগুলি। ফলে, গত বছর থেকেই বাংলাদেশে বহু দুর্গাপূজা বন্ধ হয়েছে মৌলবাদী ফতোয়ার জেরে। আতঙ্কের পরিবেশে বহু পূজা কমিটি আর দুর্গাপূজার আয়োজন করেনি। আর যারা করেছিল, তা কার্যত জাঁকজমকহীন ভাবে কোনওরকমে। যা নিয়ে বিতর্ক কম হয়নি, আন্তর্জাতিক মহলেও সমালোচিত হয়েছিল ইউনূসের সরকার। তাই এবার সংখ্যালঘু হিন্দুদের দুর্গাপূজার আগে বিশেষ প্রস্তুতি নিতে চাইছে মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকার। এবার যাতে দূর্গা পূজার দিনগুলিতে কোনরকম অশান্তি বা আপ প্রতিকার পরিস্থিতি সৃষ্টি না হয় তার জন্য বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার ১৮ দফা নির্দেশিকা জারি করেছে।
হিন্দুদের এই উৎসবকে ঘিরে সম্ভাব্য সব নাশকতা ঠেকাতে ও সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বুধবার বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বৈঠক করেছে। সেখান থেকেই ১৮ দফা নির্দেশিকা জারি করা হয়। তাতে বলা হয়েছে, দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীকে টহলদারি বাড়াতে হবে। সেই সঙ্গে সমস্ত গোয়েন্দাবিভাগকে সজাগ থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে পূজামণ্ডপগুলো পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রতিটি পূজা কমিটিগুলিকে মণ্ডপে ২৪ ঘন্টা সিসিটিভি নজরদারির পাশাপাশি যথেষ্টসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও পাহারাদার নিয়োজিত করতে হবে। প্রতিমা যেন ভাঙচুর না হয়, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু, ওই নির্দেশিকায় যে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে তা হল, প্রতিমা তৈরি থেকে পূজা সমাপ্তি পর্যন্ত প্রতিটি মন্দির বা মণ্ডপে নিজস্ব উদ্যোগে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে বলে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, যে নিরাপত্তা দেওয়ার কথা পুলিশ প্রশাসনের, তা নিজেদের উদ্যোগেই গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তায় সরকারের দায় কোথায়? উঠছে প্রশ্ন।
উল্লেখ্য, গত বছর দুর্গাপূজার আগে ফতোয়া জারি করে আতঙ্কের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল কট্টরপন্থী একাধিক সংগঠন। ইনসাফ কায়েমকারী ছাত্র-জনতা নামে এক সংগঠন রীতিমতো লিফলেট বিলি করে দাবি করেছিল, ‘দুর্গাপুজো সর্বজনীন নয়। বরং এমন দাবি করার অর্থ অন্য ধর্মকে অবমাননা করা’। সংস্থার আহ্বায়ক মুহম্মদ আরিফ আল খাবিরের নামে একটি দু’পাতার ফতোয়া সারা বাংলাদেশে বিলি করা হয়েছিল দুর্গাপূজার আগে। এছাড়া দুর্গাপুজা আয়োজন করার জন্য বিভিন্ন ক্লাবের কাছ থেকে পাঁচ লক্ষ টাকা করে চাঁদা চাওয়ার অভিযোগও উঠেছিল ঢাকার কিছু এলাকায়। পাশাপাশি ঢাকার উত্তরাতে প্রাচীন এক ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজা করা নিয়ে আপত্তি তুলেছিল এলাকার মানুষজন। তাঁদের দাবি ছিল পার্কে পুজো করা যাবে, বাজানো যাবে না ঢাক, মাইক।কারণ, তাতে নমাজে সমস্যা হয়। ওয়াকিবহাল মহলের দাবি, বিগত এক বছরে খুব একটা বদল হয়নি বাংলাদেশে। এখনও সে দেশের সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে রয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আদৌ দুর্গাপুজার আয়োজন করা যাবে কিনা তা নিয়ে অনেকেই চিন্তাভাবনা করছেন। মুহাম্মদ ইউনূস সরকারে সব ধরণের প্রস্তুতি রাখলেও তাই সন্দেহের অবকাশ রয়ে যাচ্ছে। তাই বিশ্লেষকরা বলছেন, এবার যদি দুর্গাপুজার মধ্যে বড় কোনও বিশৃঙ্খলা হয়, তাহলে ভারত ছেড়ে কথা বলবে না।











Discussion about this post