আওয়ামীলীগ সরকারের দেড় দশকের শাসনকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালে মানবতাবিরোধী ও ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। গুম, খুন ও আয়নাঘর কাণ্ডের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের পদস্থ সাবেক ও কর্মরত সেনা আধিকারিকদের মিলিয়ে মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং অভিযুক্তদের আগামী ২২ শে অক্টোবরের মধ্যে গ্রেফতার করে আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন, ৩ জন লেফটেনেন্ট জেনারেল, ৫ জন মেজর জেনারেল, ৬ জন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, ৩ জন কর্নেল এবং ৫ জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল পদমর্যাদার অফিসাররা। তারা বিভিন্ন সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার ডিজিএফআই, আধা সামরিক বাহিনীর RAF, CGIBT র গুরুত্বপূর্ণ পদ ও ৫ জন সেনা গোয়েন্দার ডিজিএফআইয়ের প্রধান ছিলেন। যাদের মধ্যে ১৩ জন অফিসার বর্তমানে কর্মরত। ফৌজদারি ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সামরিক বাহিনীর এতজনের গ্রেফতারির ঘটনা দেশের ইতিহাসে বিরল। যা নিয়ে বাংলাদেশ ক্যান্টনমেন্টে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অনেকের মতে, সাবেক যারা আছেন তারা সেফ এক্সিট খুঁজছেন আর কর্মরত সেনাদের বিষয় সেনা সদর কি ভূমিকা নিচ্ছে তা নিয়ে শুরু হয়েছে জোড় জল্পনা। যা নিয়ে উঠছে নানান প্রশ্ন, প্রথমত, বিচারের আগে কারুর বিরুদ্ধে শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া ন্যায় বিচারের মৌলিক নীতির লঙ্ঘন কিনা ?এবং এটি বিচারকের বিচারের ক্ষমতার স্বাধীনতাকে প্রশ্ন বিদ্ধ করে কিনা ? দ্বিতীয়ত, অভিযুক্ত সামরিক বাহিনীর কোনো কর্মকর্তা ও সদ্যসের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ উঠলে তার বিরুদ্ধে বিচার বা তদন্তের ক্ষেত্রে কোন আইন প্রযোজ্য ? এক্ষেত্রে কী সামরিক বাহিনীর নিজস্ব আইনে সামরিক আদালতে নাকি প্রচলিত ফৌজদারি আইনে বিচার করা হবে ?
আন্তবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর সহ দেশের রাজনৈতিক দলগুলি এই বিষয়ে কোনো বক্তব্য পেশ করেনি। বিবিসি বাংলার পক্ষ থেকে আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তরের কাছে বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে আন্তঃবাহিনীর জনসংযোগ পরিদপ্তর জানায়, এই বিষয়ে এখনো পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য নেই।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনটির সংশোধনের মদ্ধ দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘঠিত হত্যাকান্ড গুলির বিচারের উদ্যোগ নিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকার গত ১ বছরে ৪ বার আইনটিতে সংশোধন এনেছে। ৬ ই অক্টোবর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনাল আইনে নতুন সংশোধন করা হয়েছে যে এই অপরাধে অভিযুক্ত ব্যাক্তিদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ যেমন – চেয়ারম্যান, সাংসদ, মেম্বার সহ কোনো জনপ্রতিনিধি হিসেবে থাকতে পারবেন ও নির্বাচন করতে পারবেন না। এছাড়াও কোনো প্রকার সরকারি চাকরি তাদের থাকবে না। সংশোধিত আইনে অভিযুক্ত কর্মরত সেনাদের চাকরি আর থাকবে না।
আইনজীবীদের মতে, এত কম সময়ে একটি আইনের সংশোধন আইনজীবিদের নজরে নজিরবিহীন। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে যে অপরাধ হয়েছে সেইটির বিচার ১৯৭৩ সালের আইনের বিধানের সাথে যুক্ত নয়। সেটি দিয়ে করা সংবিধান সম্মত নয়। এর আগেও আওয়ামীলীগের আমলে নারায়ণগঞ্জে সেভেন মার্ডারে যারা RAB এর দায়িত্ব পালন করতেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছিলেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে তাদের ফৌজদারি আদালতে বিচার করা হয়েছিল। প্রথমে সেনাবাহিনী থেকে তাদের অবসরে পাঠানো হয়েছিল তারপর ফৌজদারি অপরাধে সাধারণ আদালতে তাদের বিচার করা হয়েছিল। এই ক্ষেত্রেও এমনটা হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে।
সেনা আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো সেনাকর্তা বা সদ্যসদের অপরাধের বিচার ২ টি আইনের আওতাধীন। একটি ১৯৫২ সালে মিলিটারি বা সেনা আইন এবং অপরটি দেশের প্রচলিত আইন।
প্রশ্ন উঠছে চাকরিতে বহাল ১৩ জন সেনা কর্মকর্তার পরিণতি কী।












Discussion about this post