বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা প্রতিনিধি দলের সফর এবং তার পরপরই সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের প্রকাশ্যে বেরিয়ে আসা, এই দুই বিষয়ে কি কোনো মিল আছে? আপাতদৃষ্টিতে মিল একটাই, ভারতীয় গোয়েন্দা দলের সফরের পরপরই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার ছুটে যান সেই এলাকাগুলিতে। আর সেই এলাকা সামরিক দিক থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিভিন্ন সূ্ত্র অনুযায়ী, ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল কুন্দন সিং-এর নেতৃত্বে একটি তিন সদস্যের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। তাঁদের ১৬ অক্টোবর ফিরে যাওয়ার কথা থাকলেও ভারতীয় প্রতিনিধি দল একদিন পর নয়া দিল্লি ফেরে। এই সফরসূচিতে তাদের লালমনিরহাট এবং সৈয়দপুরের দুটি পুরনো বিমানবন্দর পরিদর্শন অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে তাঁদের সফরে সেনাপ্রধানের সাথে কোনো সাক্ষাৎ অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে দাবি করা হয়েছে। সবমিলিয়ে আচমকা বাংলাদেশে কোন উদ্দেশ্যে ভারতীয় সামরিক গোয়েন্দা দল গিয়েছিল, সেটা নিয়েই তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা।
জানা যাচ্ছে গত ১৬ অক্টোবর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান লালমনিরহাট বিমানঘাঁটির সঠিক স্থান পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি একটি বিশাল হ্যাঙ্গারের নির্মাণ কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে ব্যক্তিগতভাবে পর্যবেক্ষণ করেন, যা সম্ভবত যুদ্ধবিমান পার্কিংয়ের জন্য ব্যবহৃত হবে। নির্মাণাধীন হ্যাঙ্গারটির সঠিক অবস্থান লালমনিরহাটের মহেন্দ্রনগর ইউনিয়নের হরিভাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত। যা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত থেকে পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহার জেলার সাথে ২০ কিলোমিটারেরও কম দূরে অবস্থিত, যা বাংলাদেশের রংপুর বিভাগের লালমনিরহাট সংলগ্ন। এই বিমানঘাঁটিটি বিমানঘাঁটিটি ১,১৬৬ একর জুড়ে বিস্তৃত এবং এখানকার রানওয়েটি প্রায় ৪ কিলোমিটার দীর্ঘ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৩১ সালে নির্মিত এই বিমানঘাঁটি বছরের পর বছর পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। যদিও ১৯৭১ সালের যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনী এটি ব্যবহার করেছিল। এখানে নতুন করে হ্যাঙ্গার নির্মাণ এবং সেনাপ্রধানের পরিদর্শনের ঘটনা অন্য সন্দেহ জন্ম দিয়েছে। বিশাল ও পরিত্যাক্ত এই বিমান ঘাঁটি অথবা এর একটি অংশ যুদ্ধবিমান পার্কিংয়ের জন্য একটি সুবিধার স্থান হতে পারে বলেই মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা। কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী তাঁদের পুরোনো J-7 বিমানের বহর প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে চিন থেকে যে কুড়িটি নতুন যুদ্ধবিমান কিনতে চাইছে, তা রাখার জন্যই এই এলাকা বেছে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সূত্র মারফৎ জানা যাচ্ছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী প্রায় ২.২ বিলিয়ন ডলারে কমপক্ষে ২০টি চীনা তৈরি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান অর্জনের জন্য একটি চুক্তি সম্পন্ন করার কাছাকাছি পৌঁছেছে। এই আবহেই যখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর একটি সামরিক গোয়েন্দা দল বাংলাদেশে অবস্থান করছেন এবং তাঁরা বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে গিয়েছিলেন। ঠিক তারপরেই বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকারের লালমনিরহাট এবং ঠাকুরগাঁও বিমান ঘাঁটি পরিদর্শনকে যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞমহল। লালমনিরহাট বিমানঘাঁটিতে হ্যাঙ্গার নির্মাণের কাজ চলছে তা কমপক্ষে ১০-১২টি যুদ্ধবিমান রাখার জন্য যথেষ্ট বড়। জেনারেল ওয়াকারের সফরের তিন দিন পরও এই হ্যাঙ্গারের ছাদের কাজ চলছে, বিমান ঘাঁটির প্রাঙ্গণে এটিই একমাত্র স্থাপনা তৈরি হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, লালমনিরহাট এবং ঠাকুরগাঁওয়ের মধ্যে দূরত্ব প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার। ঠাকুরগাঁও বিমানঘাঁটির সুরক্ষার জন্য ইতিমধ্যেই একটি নতুন স্থাপিত পরিধি প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে, যা প্রায় ৫৫০ একর জমি জুড়ে বিস্তৃত এবং একটি অব্যবহৃত ১ কিলোমিটার দীর্ঘ রানওয়ে রয়েছে। এর অর্থ হল, বাংলাদেশ ভারতের চিকেন নেক ও উত্তরবঙ্গের খুব কাছেই দুটি বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবিত করতে চলেছে। যেখানে তাঁরা আধুনিক যুদ্ধবিমান রাখতে চায়। অর্থাৎ ভারতের নাকের ডগায় যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে ভারতের রাফাল জেটের মোকাবিলা করাই কী একমাত্র লক্ষ্য, নাকি পাকিস্তানের পরামর্শে বাংলাদেশ ওই হ্যাঙ্গার নির্মান করে পাকিস্তানের ফাইটার জেটের গোপন আস্থানা তৈরি করে দিচ্ছে! এই প্রশ্নই এখন তুলছেন প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।












Discussion about this post