বিএনপির চেয়ারপার্সন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দেখতে রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে এসে পৌঁছলেন তাঁর পুত্রবধূ জুবাইদা রহমান। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টা নাগাদ রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে পৌঁছান জুবাইদা রহমান। তাঁর আগমনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। প্রসঙ্গত, জুবাইদার শাশুড়ি মা, অর্থাৎ বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরেই অসুস্থ। কিন্তু এবারের অসুস্থতা যে কোনও সময় করুণ পরিণতিতে পৌঁছতে পারে। অর্থাৎ তাঁর শারীরিক অবস্থা এই মুহূর্তে খুব সংকটাপন্ন। প্রশ্ন উঠছে, একমাত্র ছেলে তারেক সংকটাপন্ন মাকে দেখতে বা তাঁর শেষ সময়ে পাশে দাঁড়াতে দেশে ফিরতে পারলেন না কেন। সেই কারণেই বেগম খালেদা জিয়ার বর্তমান অসুস্থতা এক অসাধারণ রাজনৈতিক অস্থিরতার নজির তৈরি করেছে। আর এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে বেগম জিয়ার সাধের দল বিএনপি-র নেতা কর্মীরা।
আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের কথা মাথায় রেখে বিএনপি যে ২৩৬টি আসনে প্রাথমিক প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছিল, তাতে সবচেয়ে বড় চমক ছিল বেগম খালেদা জিয়াকে নিয়ে। কারণ, তাঁর তিন তিনটি আসন রেখেছিল বিএনপি। সেগুলি হল, ফেনী-১, বগুড়া-৭ ও দিনাজপুর-৩। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী, এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। আরেকটি তথ্য হল, বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সাল থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত যতগুলো আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সব কটিতেই বিপুল ভোটে জিতেছেন। কোনও নির্বাচনেই তিনি পরাজিত হননি। যেখানে আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দুটি ও ২০০১ সালে একটি আসনে পরাজিত হওয়ার রেকর্ড রয়েছে। সেই অনুযায়ী খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বেশি বলাই যায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুর্নীতির মামলায় ২০১৮ সালে জেলে গিয়েছিলেন। এর পর থেকেই খালেদা জিয়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে তেমন সক্রিয় নন। আবার তাঁর ছেলে তারেক জিয়াও ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ছাড়েন এবং লন্ডনে আশ্রয় নেন। সেই থেকে তিনিও বাংলাদেশের ধারেকাছে আসেননি। অথচ মা ও পুত্র দুজনেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরাবরই প্রাসঙ্গিক। কারণ, মা খালেদা জিয়া জেলে থাকাকালে তারেক লন্ডন থেকেই দল পরিচালনা করে আসছেন। দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বৈঠক করেন এবং প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়ে থাকেন। তবে গত বছর আগস্টে আওয়ামী লীগের সরকার এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বিএনপি নেতা-কর্মীরা উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়েন। তাঁরা প্রায় ধরেই নিয়েছিলেন যে এবার ভোট হলেই বিএনপি এককভাবে ক্ষমতায় আসবে। তারেক রহমান ও খালেদা জিয়ার উপর থাকা যাবতীয় অভিযোগ খারিজ করে তাঁদের বেকসুর খালাস দেওয়া হয়। জেলমুক্তি হয় খালেদার। আর সকলেই ধরে নিয়েছিলেন, এবার তারেকও দেশে ফিরবেন। কিন্তু খালেদা জিয়ার জেলমুক্তি হলেও তিনি স্থায়ীভাবে অসুস্থ ছিলেন। দু-একবার তাঁকে বাইরে দেখা গিয়েছিল। এরপরের ঘটনা সকলের জানা। অপরদিকে, ১৫ মাস অতিক্রান্ত হলেও তারেক দেশে ফেরেননি। এমনকি মা সংকটজনক হলেও তিনি ফিরবেন না বলে জানিয়ে দেন। ফলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়।
এদিকে শেখ হাসিনার পতনের পর তাঁর বিরুদ্ধে লড়াই করা রাজনৈতিক দলগুলো পরস্পরের বিরুদ্ধে বিতর্কে নেমেছে। বর্তমান পটভূমিতে সবাই চায় নিজেদের মতামত প্রতিষ্ঠিত করতে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক বিতর্ক ও মতভেদ গণতান্ত্রিক পরিবেশের সীমা ছাড়িয়ে রীতিমতো কলহের রূপ নিয়েছে। এখানেই বিএনপির শীর্ষ নেতারা তারেক রহমানের অভাব অনুভব করেছেন। কারণ, এই দলটি আওয়ামী লীগ ও ভারতের কংগ্রেসের মতো নিতান্তই পারিবারতান্ত্রিক। খালেদা জিয়া এবং তারেক জিয়া যা বলবেন, সেটাই হবে। ফলে এই মুহূর্তে অসুস্থ খালেদা এবং তাঁর জন্য ব্যস্ত তারেক তাঁদের কোনও দিশা দেখাতে পারছেন না। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে দেশে ফেরা কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা বোঝার মতো রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিশ্চয়ই আছে তারেক রহমানের। তাঁর দেশে না ফেরা নিয়ে ওঠা প্রশ্ন তাঁকে রাজনৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, এটিও তাঁর না বোঝার কারণ নেই। এসব বিতর্ক–সমালোচনার পরও তাঁর ফিরে না আসা প্রমাণ করে, সমস্যা সমাধান করা ছাড়া তাঁর ফেরাটা বিপজ্জনক হতে পারে। ফলে বিএনপির চাপ বাড়ছে। তাঁদের অবস্থা এখনই পাল ছেঁড়া নৌকার মতো।












Discussion about this post