‘হইচই, কোলাহল, তুমুল বাগবিতণ্ডা আর অস্ত্রের দাপাদাপি এড়িয়ে /যে শিশু এক পেটে খিদে নিয়ে একা একা ঘুমিয়ে পড়েছে/ তাকে জাগিও না।/ সে হয়তো স্বপ্ন দেখছে গরম ভাতের,/ আরও কটা বাচ্ছা-কাচ্ছা জুটিয়ে/ সে হয়তো স্বপ্নে খোলা মাঠে লাল বেলুন নিয়ে খেলা করছে/ তাকে জাগিও না। /জেগে উঠলে তাকে এক ভয়ঙ্কর নরকের মধ্যে ঢুকে পড়তে হবে, / যেখানে শুধু হিংসা আর লোভ কথা বলে।’
বর্তমান বিশ্বে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, কবি অরণি বসুর ‘তাকে জাগিও না ’ কবিতা তার সঙ্গে যেন মিলে একাকার হয়ে যায়। যুদ্ধের গন্ধে মঁ মঁ করছে সারা বিশ্ব। ভেনেজুয়েলে থেকে গ্রিনল্যান্ড, ইরান থেকে ইওরোপ, এশিয়া-আফ্রিকা বা ইউরোপ মহাসাগরের বুক- খইয়ের মতো যেন ফুটছে সব। এমন সব ঘটনা ঘটছে চারপাশে যা গত দুটি বিশ্বযুদ্ধের আগেও ঘটেনি। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সব লক্ষ্মণ প্রকাশ পেয়ে গিয়েছে এরই মধ্যে। বিশ্ব যেন বসে আছে চরম এক সর্বনাশের অপেক্ষায়।
জাতিসঙ্ঘ যেন এক অকেজো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। যে আইন দিয়ে বিশ্বকে শান্ত রাখার কথা ছিল, পরাশক্তিগুলো আজ সেই আইনের কপালে লাথি মেরে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো চলছে। অবস্থা এমন একটা পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন আর কূটনৈতিক আলোচনার টেবিল নয়, যুদ্ধের মাঠ হল সমাধানের একমাত্র রাস্তা। পৃথিবী এখন আর কোনও নিয়ম বা শৃঙ্খলার তোয়াক্কা তো করছে না। বরং এক উন্মত্ত কসাইখানায় পরিণত হয়েছে। যেখানে কেবল ধারাল ছুরির দাপটই শেষ কথা। রাশিয়ার একটা বাণিজ্যিক জাহাজ মাঝ সমুদ্র থেকে তুলে নিয়ে তার ক্রুদের বিচার করার যে ধৃষ্টতা আমেরিকা দেখাল তা গত এক শতাব্দীতে কেউ দেখেনি। এটা স্রেফ আইন লঙ্ঘন নয়, এটা আন্তর্জাতিক সার্বভৌমত্বকে প্রকাশ্য চড় মারা। সমুদ্রে মুক্ত চলাচলের যে আন্তর্জাতিক নিয়ম ছিল, তাকে এক নিমেষেই ধুলোয় মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে। ফলাফল যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা আমরা কল্পনাও করতে পারিনি।
এর ঠিক কয়েকদিন আগেই সস্ত্রীক ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ফিল্মি কায়দায় তুলে নিয়ে যাওয়া হল, তাতে পরিষ্কার হয়ে গেল এখন আর কোনও দেশের রাষ্ট্রপ্রধান নিরাপদ নন। কোনও সার্বভৌম দেশের প্রধানকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে অন্য একটি দেশের বিচারের কাঠগড়ায় তোলা আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে সব থেকে কলঙ্কিত অধ্যায়। এর মানে দাঁড়ায় এখন থেকে পৃথিবীর কোনও সীমানা প্রাচীরই আর অলঙ্ঘনিয় নয়।
এদিকে ইরানের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ। এখন আর শুধু গুঞ্জন নয়, এটা ধ্রুব বাস্তব। ইরান-ইজরায়েল সীমান্তের উত্তেজনা এখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায়। অস্ট্রেলিয়া আর রাশিয়া তাদের নাগরিকদের ওই দুটি দেশ থেকে স্বদেশে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে। গোয়েন্দ রিপোর্ট বলছে, যে কোনও মুহূর্তে বড়ো ধরনের হামলা শুরু হয়ে যেতে পারে। আমেরিকা আর ইজরায়েল যৌথভাবে ইরানের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক এবং পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালানোর জন্য সব গুছিয়ে ফেলেছে। ইরানের তৈল খনি থেকে শুরু করে ড্রোন তৈরির কারখানা সবই এখন টার্গেটের মধ্যে। ইরানও চুপ করে বসে নেই। তারা যে পাল্টা আঘাতের হুমকি দিয়েছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যের পুরো মানচিত্র বদলে যেতে পারে। একটি দেশ অপর একটি দেশের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে। এটা কেবল আঞ্চলিক কোনও কোন্দল নয়, এটা হল গ্লোবাল চেইন রি-অ্যাকশন। এটা আমাদের তৃতীয়বিশ্বযুদ্ধের খাদের কিনারায় নিয়ে গিয়েছে। একটা বিষয় স্পষ্ট এই বিপদের দিনে কোনও রাষ্ট্র কারও আপন নয়। আমরা যাদের বন্ধু ভাবি তারা আসলে সাময়িক স্বার্থের ভাগীদার।
পাকিস্তান এখন বাংলাদেশের অত্যন্ত এক মিত্র দেশ। ভারত যদি কোনও কারণে বাংলাদেশের ওপর হামলা করে বসে, তাহলে পাকিস্তান সে দেশের পাশে দাঁড়াবে এটা ভাবা ভুল হবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কে আবেগ বা ভালোবাসার কোনও জায়গা নেই। ভেনেজুয়েলার প্রাণের বন্ধু ছিল চিন আর রাশিয়া। কিন্তু মার্কিন কম্যান্ডোরা যে মুহূর্তে তাঁকে তুলে নিয়ে গেল, তখন সেই বন্ধুরাষ্ট্র কেবল দূর থেক বিবৃতি দিয়েই খালাস। তারা তাদের বন্ধুকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি। দিন শেষে পরাশক্তিগুলি তাদের ভূরাজনৈতিক লাভ-ক্ষতির হিসেব কষে। ইউক্রেনকেও পশ্চিমা বিশ্ব সব দেওয়ার ও পাশে থাকার আশ্বাস দিয়েছিল। উল্টে তারা দেশটিকে রুশ আগুনের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ইউক্রেন আজ এক পরিত্যক্ত শ্মশান। সেখানে কেবল ‘হাহাকার, সেই অশ্রুবারিধারা, হৃদয় বেদনা’। আর ধ্বংসস্তুপ। আমেরিকা এখন সেই দেশের জন্য বরাদ্দ হ্রাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের নতুন টার্গেট এখন অন্য কোথাও আমেরিকা এখন দুধ দেখিয়ে ঘোল খাওয়াচ্ছে। স্বার্থের প্রয়োজনে আমেরিকা তাদের নিজের ঘরের বন্ধুকেও পর করতে এক সেকেন্ড দ্বিধা করবে না।












Discussion about this post