প্রবাদ আছে – বাঘের পিঠে ওঠা সহজ। কিন্তু পিঠ থেকে নামতে হয় বাঘের ইচ্ছায়।
বাংলাদেশের তদারকি সরকার প্রধান মুহম্মদ ইউনূস এখন বুঝতে পেরেছেন বাঘের পিঠ থেকে এখন আর তাঁর নামার উপায় নেই। একমাত্র বাঘ যখন চাইবেন, তখনই তিনি নামতে পারবেন। ইউনূস এখন এটাও বেশ ভালোই বুঝতে পারছেন যে গত ১৫-১৬ মাস ধরে তিনি যে সব পদক্ষেপ করেছেন, সেই সব পদক্ষেপের প্রতিটি শুধুমাত্র ভুল ছিল না, পদক্ষেপগুলি ছিল আত্মঘাতী। আওয়ামী লীগের মতো বৃহৎ একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, নির্বাচন কমিশনকে দিয়ে তাদের দলীয় প্রতীক ফ্রিজড করে দেওয়া, ওই দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা রুজু করে তাদের জেলে পাঠিয়ে দেওয়া, সর্বোপরি বাংলাদেশের মাটিতে ভারত-বিদ্বেষী শক্তিকে আস্কারা দেওয়া – সব কিছু ছিল আত্মঘাতী পদক্ষেপ।
প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে সে দেশের সম্পর্ক কেমন, সেটা আর কারও অজানা নয়। ‘আওয়ামী লীগ’ – এই শব্দটার অভিঘাত কতটা, সেটা ইউনূস এখন বুঝতে পেরে আঁতান্তরে পড়েছেন। দল আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নেই। তবুও তারা ভীষণরকমভাবে আছে। আর সেটাই তদারকি সরকার প্রধানের কাছে বড়ো মাথা ব্যথা হয়ে উঠেছে। কারা ক্ষমতায় আসতে চলেছে, সেটা কিন্তু প্রায় পরিষ্কার। তদারকি সরকার প্রধান এখন বুঝতে পারছেন না তার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হওয়া উচিত। তিনি এটাও এখন বুঝতে পেরেছে, যাঁদের কথা তিনি এতোদিন চলে এসেছেন, তাঁরা তাকে ভুল পরামর্শ দিয়েছিল। আর তিনি অন্ধের মতো সেই পরামর্শ কার্যকর করেছেন। সেটা বোঝা যাচ্ছে আওয়ামী লীগ নিয়ে তাঁর সর্বশেষ অবস্থানে। তিনি বিশেষ একটি শব্দবন্ধনী ব্যবহার করেছেন ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’।
আগে দেখে নেওয়া যাক ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ বলতে কী বোঝায়? রিকনসিলিয়েশন কমিশন মূলত আদালতের বাইরের সত্য-অনুসন্ধান এবং নিরাময় প্রক্রিয়া। কোনো দেশে গণহত্যা, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত নিপীড়ন বা দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর গঠিত হয়। এর উদ্দেশ্যে অতীতে কী ঘটেছিল, তা দলিল-প্রমাণসহ তুলে আনা। এতে অপরাধীরা সত্য স্বীকার করলে কখনও কখনও শাস্তিমুক্তি পেতে পারেন। এই ধরনের কমিশনের মাধ্যমে বিভক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের দীর্ঘ শাসনের পর ক্ষমতায় এসে কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এই ধরনের কমিশন করেছিলেন। কমিশনে শ্বেতাঙ্গরা শতবর্ষ ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চালানো আক্রমণের কথা স্বীকার করে নেন। আর কৃষ্ণাঙ্গদের তরফ থেকেও শ্বেতাঙ্গদের ক্ষমা করার কথা বলা হয়। রুয়ান্ডা গণহত্যার পর গাচাচা কোর্টও রিকনসিলিয়েশন উদ্যোগ। চিলি ও আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনের নির্যাতনের পরও রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন হয়।
একই কথা শোনা যায় আইনি উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মুখেও। তিনি বলেন, “ট্রুথ জাস্টিস কমিশন অথবা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ এর খুব দরকার আছে। সম্ভবত এটা আমাদের দেশে ১৯৭২ সাল থেকেই থাকলে ভালো হতো। আমরা সবকিছুই খুব পেশাদারভাবে নিষ্পত্তি করতে চাই।… আমরা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ করব।”
তদারকি সরকার প্রধান হঠাৎ করে এই সব কথা বলছেন কেন, সেটার বিশ্লেষণ আগে প্রয়োজন। আর কোন সময়ে বলেছেন, সেটাও কিন্তু বেশ নজরকাড়ার মতো। একদিকে তিনি রিকনসিলিয়েসনের কথা বলছেন, আবার অপরদিকে বলছেন এখন আর তার সময় নেই, প্রয়োজনও হবে না। এই সব বক্তব্য কিন্তু বেশ স্ববিরোধী। প্রশ্ন এটাও যে তিনি কি কোনওভাবে হাসিনার দলের থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়েছেন? যে দলটির নাম তিনি উচ্চারণ করতেন ঘৃণার সঙ্গে, আজ সেই দলকে নিয়ে রিকনসিলিয়েশন! তাহলে কি তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার বার্তা দিলেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, তদারকি সরকার প্রধান হাসিনার দলের সঙ্গে সমঝোতা চাইলেও হাসিনা কোনওভাবেই সমঝোতা করবেন না। আওয়ামী লীগ এই চাপের মধ্যে থেকেও না ইউনূসের সঙ্গে কোনও সমঝোতা করেছে, না তাঁর সরকারের সঙ্গে। এই অনড় অবস্থান ব্যাকডোরে কথা চালিয়ে যাওয়ার সব চ্যানেল ভেঙে দিয়েছে। আওয়ামী লীগ একটা কথা দেশবাসীকে বোঝাতে পেরেছেন। সেটা হল যেটুকু অন্যায় যেটুকু হয়েছে সেটা করতে বাধ্য হয়েছে। না হলে রাষ্ট্রকে সন্ত্রাসীদের হাত থেকে কোনও ভাবেই রক্ষা করা যেত না। এর বাইরে যে সব অভিযোগ আনা হয়েছে, তার কোনও ভিত্তি নেই। এর একটাই উদ্দেশ্য রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগকে ঘায়েল করা।












Discussion about this post