২০২৪ সালের জুলাই আগস্ট সরকারবিরোধী বিক্ষোভের ফলে বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে এবং দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতির আঙিনায় অতি সক্রিয় হয়ে ওঠে একদা নিষিদ্ধ কট্টরপন্থী সংগঠন জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ। তাঁদের পরিকল্পনায় আওয়ামী লীগের পর বিএনপিকেও বাংলাদেশে দুর্বল করে দেওয়ার বিষয়টি ছিল। সেই মতোই এগোচ্ছিল ডঃ সফিকুর রহমানের দলটি। জামাত নেতৃত্ব যে নেপথ্যে মুহাম্মদ ইউনূস সরকার পরিচালনা করছে সে কথা এখন দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। ফলে ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বহু সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশের পিছনে জামাতের ছায়া লক্ষ্য করা গিয়েছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় তারেক রহমান আচমকা দেশে ফিরে আসায়। গত বছর নভেম্বর মাসে যখন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ, রীতিমতো জীবন মৃত্যুর মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে, তখনও তাঁর পুত্র তারেক দেশে না ফিরতে পারার কথা বলছেন। কোনও এক রহস্যময় তৃতীয় পক্ষের কথা বলে তিনি জানাচ্ছেন তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত একক নয়। কিন্তু একমাসের মধ্যেই আশ্চর্যজনকভাবে পরিস্থিতি পাল্টে গেল, আর তারেক সপরিবারে বাংলাদেশ ফিরলেন তাঁর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে। আর অভূতপূর্বভাবে পরিস্থিতি বদলে গেল বাংলাদেশে। এখন ভোটমুখী বাংলাদেশে যাবতীয় ফোকাশ যেন তারেককে ঘিরেই। দীর্ঘদিনের সাজানো বাগান যেন শুকিয়ে যেতে শুরু করলো জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশের। এরই মধ্যে একটা তৎপরতা দেখা গেল বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে। যা জামাতকে আবার লাইম লাইটের আলোয় নিয়ে এল।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট সম্প্রতি একটি বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। তাঁদের দাবি, মার্কিন কূটনীতিকরা ইঙ্গিত দিয়েছেন যে তাঁরা জামায়তে ইসলামীর সাথে কাজ করার জন্য তৈরি, যারা বাংলাদেশের ইতিহাসে একাধিকবার নিষিদ্ধ ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশের এই কট্টর ইসলামপন্থী দল জামাতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি করতে চাইছে আমেরিকা। এর জন্য তাঁরা নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও নাকি তৈরি করে ফেলেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট দাবি করেছে, বাংলাদেশে উপস্থিত মার্কিন কূটনীতিবিদদের সঙ্গে স্থানীয় কিছু সাংবাদিকদের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ডিং তাদের হাতে এসেছে। তার ভিত্তিতেই এই প্রতিবেদন তাঁরা তৈরি করেছে। সেখানে এক মহিলা সাংবাদিককে ওই মার্কিন কূটনৈতিক বলছেন, ‘‘আমরা জামাতের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতেই চাই। আপনারা কি ওদের সঙ্গে কথা বলতে পারবেন? ওঁরা কি আপনাদের অনুষ্ঠানে আসতে রাজি হবেন?’’ কথোপকথন অনুসারে ওই মার্কিন কূটনীতিক দাবি করেছেন, বাংলাদেশে ক্ষমতায় এলেও জামাত তাদের কট্টর ইসলামপন্থাকে বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দিতে পারবে না, সেটা হলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেবে। তাঁকে বলতে শোনা গিয়েছে, ‘‘জামাত শরিয়া চাপিয়ে দেবে, আমি এটা বিশ্বাসই করি না। আর যদি দলের নেতারা তা করার চেষ্টা করেন, আমেরিকা পরের দিনই তাঁদের উপর ১০০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেবে’’। জানা গিয়েছে এই অডিও টেপটি গত ১ ডিসেম্বরে ঢাকায় একটি রুদ্ধদ্বার অনুষ্ঠানের।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহল ওয়াশিংটন পোস্টের এই প্রতিবেদন সামনে আসার পর মিশ্র প্রতিক্রিয়া দিয়েছে। কেউ কেউ বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র যে কারণে বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটিয়ে সরকার পরিবর্তন করেছিল, সেই কাজ তাঁরা পূর্ণ করতে পারেনি। তাই সেটি পূর্ণ করতে জামাতের মতো কট্টরপন্থী দলকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় চাইছে ওয়াশিংটন। পাকিস্তানকে দিয়ে তাঁরা জামাতকে পূর্ণ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আরেকটি বাধ্যবাধকতা রয়েছে, সেটা হল ইসলামি শরিয়া আইন মেনে সরকার পরিচালনার পক্ষপাতী জামাত। এটা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি বিরুদ্ধ। আমরা বরাবরই দেখে এসেছি, ইসলাম প্রসঙ্গে মার্কিন নীতি হল ধরি মাছ না ছুঁই পানী। অর্থাৎ, তাঁরা নিজেরা ইসমামিক সংগঠনগুলি থেকে প্রকাশ্যে দূরত্ব বজায় রাখে, কিন্তু ঘুরিয়ে তাঁদের দিয়ে বহু কাজ সম্পন্ন করে নেয়। এ ব্যাপারে ওয়াশিংটন বরাবরই পাকিস্তানকে তাঁদের স্ট্রাটিজিক পার্টনার হিসেবে ব্যবহার করে এসেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তাঁরা পাকিস্তানকে ব্যবহার করে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করতে উঠেপড় লেগেছে। ঢাকায় আমেরিকার দূতাবাসে মার্কিন রাষ্ট্রদূত হিসাবে সদ্য যোগ দিয়েছেন ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন। তিনি কাজে যোগ দিয়েই তৎপর হয়ে উঠেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ইউনূসের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গিয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে বেশ কিছু ক্ষণ আলোচনা হয়। তারমধ্যেই ওয়াশিংটন পোস্টে এই বিস্ফোরক প্রতিবেদন প্রকাশিত হল। এরমধ্যে মিল খুঁজছেন অনেকেই। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়েই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি যে জাতীয় নির্বাচন হতে চলেছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত। তবুও মার্কিন রাষ্ট্রদূতকে নাকি বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দাবি করেছেন, এই ভোট হবে অবাধ, সুষ্ঠু এবং সার্বিক যোগদানমূলক। এখন দেখার মার্কিন সংবাদমাধ্যমের এই দাবির পর ভারত কোনও প্রতিক্রিয়া দেয় কিনা, কারণ জামাত বাংলাদেশের ক্ষমতায় এলে তা মোটেই ভারতের আভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য সুখকর হবে না। ফলে মার্কিন এই উদ্দেশ্য ভারত কোনও ভাবেই মেনে নেবে না। যদিও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তরফে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের সঙ্গেই কাজ করতে আগ্রহী, নির্দিষ্ট কোনও দলকে নিয়ে তাঁরা ভাবছে না।












Discussion about this post