বাংলাদেশে নির্বাচন শেষ। সেই সঙ্গে শেষ হল যাবতীয় জল্পনা-কল্পনা। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন। জামায়াতে ইসলামি জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। অন্যান্য আটটি আসন। ৩০০টি আসনের মধ্য একটি আসনে প্রার্থীর মৃত্যু হয় কেন্দ্রটি ভোটগ্রহণ হয়নি। দুটিতে ফল ঘোষণা স্থগিত রাখা হয়েছে। জুলাই সনদ নিয়েও হয়ে গিয়েছে গণভোটাভুটি। হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন ৪ কোটি ৮০ লক্ষের বেশি ভোটদাতা। ‘না’ ভোট দিয়েছেন ২ কোটি ২৫ লক্ষ। এর ফলে প্রশাসনিক এবং নির্বাচনী সংস্কারের যে প্রস্তাব সনদে রয়েছে, তা বাস্তবায়িত করার কথা পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের। সেই সঙ্গেই জুলাই সনদে রয়েছে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৮৪ দফা প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংস্কারের ঘোষণা। এর মধ্যে ৪৭টি প্রস্তাবনা সাংবিধানিক এবং ৩৭টি সাধারণ আইন বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করার কথাও জানিয়েছে ইউনূস সরকার। গণভোটে ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব থাকলেও তার মধ্যে কোনওটি নিয়ে বিএনপি, কোনওটি নিয়ে জামায়াতে ইসলামী (‘জামাত’ বলেই পরিচিত) আবার কোনওটি নিয়ে এনসিপির আপত্তি রয়েছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে এ বিষয়ে ‘আপত্তিসূচক বক্তব্য’ (নোট অফ ডিসেন্ট) নথিভুক্ত করিয়ে রেখেছে তারা।
মূল চারটি বিষয়ের ওপর গণভোটের আয়োজন করা হয়। চারটি বিষয় হল নির্বাচনের আগে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন এবং অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়া অনুসারে গঠন করা হবে। পরবর্তী সংসদ হবে দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ জন সদস্য বিশিষ্ট উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সেই সঙ্গে সংবিধান সংশোধন করতে হলে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। তৃতীয় বিষয় ছিল সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচারবিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকার-সহ বিভিন্ন বিষয়ে যে ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলির ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলি বাস্তবায়নে নির্বাচনে বিজয়ী দল বা জোট বাধ্য থাকবে। চতুর্থ এবং শেষ প্রস্তাব বিষয় ছিল জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলির প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাব হল, প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন কোনও ব্যক্তি আর সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রধান বা শীর্ষপদে থাকতে পারবেন না।
বাংলাদেশ নির্বাচনে দুটি বিষয় বেশ নজরকাড়া। একটি হল বিএনপির ভূমিধস বিজয় এবং জামাতের রকেট গতিতে উত্থান। ভোটের আগে পদ্মাপারে অদ্ভূত একটা হাওয়া বইতে শুরু করে। হাওয়া ছিল জামাতের পক্ষে। দিল্লির কর্তাব্যক্তিরা জামাতের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করে। আমেরিকা জামাতের বিষয়ে সবুজ সংকেত দিয়েছিল। তারা চেয়েছিল জামাত ক্ষমতায় আসুক। ব্রিটেনের কূটনীতিকরা জামাত নেতাদের সঙ্গে দেখা করে। জামাত নেতার নাসির উদ্দীন পাটোয়ারীর চালচলন ছিল বেশ চোখে পড়ার মতো। আর জামাতকে প্রমোট করেছিল ইলিয়াস এবং পিনাকি। তাদের দুজনে ভীষণরকম আত্মবিশ্বাসী ছিল। তাদের মনে হয়েছিল বাংলাদেশে তাদের কোটি কোটি ফলোয়ার আছেন। তারা বাংলাদেশ এলে বিএনপি নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আর জামাত নতু করে রাজনীতি করতে পারবে। সোশ্যাল মিডিয়া এই দুই তাত্ত্বিক নেতা জামাতকে নিয়ে বেশ কয়েকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্টও করে। ফল প্রকাশের পর দেখা গেল জামাত ক্ষমতায় আসেনি। তবে তাদের ফলাফল খুব ইতিবাচক। অতীতে বাংলাদেশে জামাতের ভোটের ফল এতটা নজরকাড়া ছিল না। যদিও এই ফলাফলের পরেও তারা ক্ষমতায় আসীন হতে পারছে না। সেটা একদিকে তাদের পরাজয়। কিন্তু নজিরবিহীন সাফল্যে তাদের নৈতিক জয় হয়েছে।












Discussion about this post