মঙ্গলবার বাংলাদেশের নতুন মন্ত্রিসভার শপথের মধ্য দিয়ে শেষ হল মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের সমালোচিত এবং বিতর্কিত দেড় বছরের শাসনকাল। এই উপদেষ্টামন্ডলীর মধ্যে মাত্র একজন তারেক রহমান মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়েছেন। বাকিদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত। বাংলাদেশ জুড়ে রটনা, ইতিমধ্যেই বহু উপদেষ্টা ও বিভিন্ন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারীরা দেশ ছাড়তে তৎপর। এরমধ্যে কয়েকজন নাকি ইতিমধ্যেই গোপনে বাংলাদেশ ছেড়েছেন। বাকিরাও সুযোগের অপেক্ষায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ওই বছরই ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশের কয়েকজন এবং প্রবাসে থাকা আরও কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন হয়। পরবর্তী সময়ে এই উপদেষ্টা পরিষদে সংযোজন ও বিয়োজন হয়েছে। কিন্তু বিগত দেড় বছরে ইউনুসের উপদেষ্টা মন্ডলীর বেশ কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে উঠেছে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ। যদিও এই অভিযোগের কোনটাই গুরুত্ব দেননি প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
২০২৫ সালের আগস্ট মাস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের এক বছর পূর্তির পরপরই কয়েকজনের বিরুদ্ধে ওঠে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ। তৎকালীন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আটজন উপদেষ্টার ‘সীমাহীন দুর্নীতি’র প্রমাণ তাঁর কাছে রয়েছে বলে দাবি করেন। সে সময়ই এই দাবি ঘিরে তোলপাড় হয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির অঙ্গন। যদিও মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় এক সঙ্গে এত জন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগের পরপরই সরকারের দিক থেকে তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছিল। আসলে বাংলাদেশে তখন ইউনূস রাজ। তাই গণমাধ্যম বা অন্যান্য মাধ্যমে তা নিয়ে আর খুব বেশি হইচই হয়নি। কিন্তু ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন এবং দুদিনের মাথায় ফলাফলে বিএনপির জয়জয়কার হতেই পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছে। সে সময় বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল আলমগীর জানিয়েছিলেন খালেদা জিয়ার একান্ত সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তারের অভিযোগ তার একান্ত ব্যক্তিগত। কিন্তু আজ বিএনপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হিসাবে সরকার গঠন করার পর ওই বিএনপি নেতা দাবি নতুন করে সামনে আসছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের মতে সরকার গঠনের পরই তারেক রহমান পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টাদের কাজকর্মের যথাযথ অডিট করতে পারেন। এই সম্ভাবনা সামনে আসতেই বহু উপদেষ্টা দেশ ছাড়ার চেষ্টা শুরু করেছেন বলেই খবর।
আল জাজিরা টিভির সাংবাদিক বাংলাদেশের জুলকারনাইন শায়ের দিন দুয়েক এক আগেই একটি ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছিলেন দুজন উপদেষ্টা দেশ ছাড়ছেন। জানা যাচ্ছে, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারীর দায়িত্ব পালন করা এবং বাংলাদেশের ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়-এর দায়িত্বে থাকা ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ইতিমধ্যেই দেশ ছেড়েছেন। তিনি তাঁর পরিবারের কাছে নেদারল্যান্ডসে ফিরে গেছেন। এরকম বহু উপদেষ্টা আছেন যারা তাদের ডিপ্লোম্যাটিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে পুরনো সাধারণ পাসপোর্ট ফেরত নিয়েছেন। কেউ চিন বা কেউ মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বিদেশে পালানোর ছক করছেন বলেই খবর। এর কারণ হিসেবে উঠে আসছে ওই অডিট প্রসঙ্গ।
বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়ার সাবেক সহকারী একান্ত সচিব মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে উঠেছিল কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ। বাংলাদেশের দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক এই অভিযোগে মোয়াজ্জেম হোসেনকে গ্রেফতার করে। এমনই বহু অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশ অন্তর্বর্তীকালীন উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। জানা যাচ্ছে বিএনপি সরকার এদের বিরুদ্ধে নতুন করে অডিট করতে পারে। তাতেই রাতের ঘুম উড়েছে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনুস সহ বেশ কয়েকজন উপদেষ্টার। অনেকেই দেশ ছাড়ার প্রস্তুতি নিয়ে ফেলেছেন, কেউ কেউ বাংলাদেশ ছেড়েছেন বলেই খবর।
এখানে প্রশ্ন উঠছে মুহাম্মদ ইউনূস কি করবেন? বাংলাদেশের প্রথম সারির সংবাদ মাধ্যম প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আগে যে কাজগুলো করতেন, সেগুলো করবেন। ক্ষুদ্রঋণ ও “থ্রি জিরো” ভিশন এবং সামাজিক ব্যবসা নিয়ে সারা বিশ্বে কথা বলবেন। সমালোচকরা বলছেন, তিনি মানব সম্পদ উন্নয়ন ব্যবসায় যুক্ত হতে চাইছেন। বাংলাদেশের আইন ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ নজরুল গত মঙ্গলবার প্রথম আলোকে বলেছিলেন, উপদেষ্টার দায়িত্ব শেষে তিনি আবার আগের পেশায়, অর্থাৎ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ দায়িত্ব শেষে আবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেবেন। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন আগের মতোই লেখালেখিতে ফিরতে চান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি বা বেলা-র কাজে ফিরবেন। সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ ব্রতীতে ফিরে যাবেন এবং মানবাধিকার বিষয়ে কাজ করবেন। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম তার ফেসবুক পোস্টে বুঝিয়ে দিচ্ছেন তিনিও বিদেশে ফিরে যেতে চান। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের দাবি, পূর্ববর্তী উপদেষ্টারা যেন বাংলাদেশেই থাকেন। তাদের কার্যকালে হওয়া দুর্নীতি ও অপরাধের তদন্ত যথাযথভাবে হোক। এখন দেখার শেষ পর্যন্ত কি হয়।












Discussion about this post