বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঠিক আগেই আন্তর্জাতিক বার্তা সংবাদসংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সে দেশের রাষ্ট্রপতি কয়েকটি ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। যার মধ্যে তাঁর সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছাপ্রকাশ নিয়ে কম আলাপ-আলোচনা হয়নি। অনেকেই ভেবে নিচ্ছেন হয়তো বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু সরে দাঁড়ালে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি মুহাম্মদ ইউনূসের স্থান পাকা। কিন্তু ফের সঠিক সময়ে সঠিক চাল দিলেন বর্তমান রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তিনি পাবনা জেলার স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল তিনি ভারতে যান এবং প্রশিক্ষণ নিয়ে পাবনা জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি বাংলাদেশের জেলা ও দায়রা জজ এবং দুদকের কমিশনার ছিলেন, সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য পাবনা জেলা প্রেস ক্লাবের আজীবন সদস্য মনোনীত হয়েছেন। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।
আবার মোহম্মদ সাহাবুদ্দিন ছাত্রজীবনে পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি এবং ১৯৭৪ সালে পাবনা জেলা যুবলীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। এমনকি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর তিনি কারাবরণ করেছিলেন। পরবর্তীতে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়েছিলেন। তিনি একাই বড় দায়িত্ব নিয়ে গ্রামীণ ব্যাংক দুর্নীতি ও পদ্মা সেতুর বিষয়ে আগেও ইউনুস ও আমেরিকার আন্তর্জাতিক চক্রান্তকে প্রতিহত করেছেন। ঘটনা হল, তাঁর রাষ্ট্রপতি হওয়ার পর বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের ঘটনা ঘটেছে। সেটা হল গণঅভ্যুত্থান। শেখ হাসিনা সরকারের পতন এবং বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষমতায় আসা। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি সব ঘটনার সাক্ষী। এখন ইউনূসের সরকার গিয়েছে, বাংলাদেশের ক্ষমতায় বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আবারও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মুখ খুললেন, তবে এবার অন্যভাবে, অন্য আঙ্গিকে।
গত শুক্রবার রাতে বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু একান্ত সাক্ষাৎকার দিয়েছেনকালের কণ্ঠের নির্বাহী সম্পাদককে। সেই সাক্ষাৎকারের ছত্রে ছত্রে উঠে এসেছে গত দেড় বছরে তাঁর বন্দিদশার গল্প। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি খোলাখুলিভাবে বলেছেন, সপ্তাহখানেক ধরে খুব ভালো আছেন। তারপরই একটি দীর্ঘস্বাস ফেলে তিনি বলেছেন, বিগত দেড় বছর আমি কোনও আলোচনায় নেই অথচ আমাকে নিয়ে চলেছে নানা চক্রান্ত। অর্থাৎ বিস্ফোরক কিছু দাবি করেছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি। যেমন তিনি কালের কণ্ঠকে এবার নিঃসংকোচে বলেছেন, দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা চিরতরে ধ্বংস করার এবং সাংবিধানিক শূন্যতা সৃষ্টি করার অনেক পাঁয়তারা হয়েছে। যেমন ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের একজন উপদেষ্টা বেআইনিভাবে একজন সাবেক প্রধান বিচারপতিকে রাষ্ট্রপতির চেয়ারে বসানোর প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সেই বিচারপতির সততা ও সাংবিধানিক বিধিনিষেধের কারণে সরকারের সেই অসাংবিধানিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। আবার সাহাবুদ্দিন সাবেহ বলেছেন, সংবিধানে বলা আছে, সরকারপ্রধান বিদেশ সফর শেষে রাষ্ট্রপতিকে অবহিত করবেন। কিন্তু ড. ইউনূস গত দেড় বছরে ১৪-১৫ বার বিদেশ গেলেও একবারের জন্যও বঙ্গভবনে এসে রাষ্ট্রপতিকে কিছু জানানোর সৌজন্যটুকু দেখাননি। এতটাই স্বৈরাচারি ছিলেন মুহাম্মদ ইউনূস।
এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তাঁকে উৎখাৎ করা বা অপসারণের বিভিন্ন প্রচেষ্টার খবর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে রাষ্ট্রপতি জানান, আমাকে কতভাবে উপড়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে! কোনো পরিস্থিতিতেই আমি ভেঙে পড়িনি। আমি বলেছি, আমার রক্ত ঝরে যাবে বঙ্গভবনে। রক্ত ঝরে ঝরুক। আরেক ইতিহাসে আমি যোগ হব। কিন্তু আমি সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করব, আমি এই সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলাম। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর বঙ্গভবন ঘেরাওয়ের প্রসঙ্গ তোলেন। সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে সাহাবুদ্দিন চুপ্পু এক রোমহর্ষক পরিস্থিতির কথা শুনিয়েছেন। তাঁর দাবি, রাতারাতি সৃষ্টি হওয়া বিভিন্ন ফোরাম তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিল। একদিন বঙ্গভবন ঘেরাও হয়। ওই দিন রাতে যখন ঘেরাও করা হয়, তখন সেনাবাহিনীর নবম ডিভিশন থেকে ফোর্স এসে তিন স্তরে নিরাপত্তা দিয়েছিল। সে সময় একটি মেয়ে লাফ দিয়ে কাঁটাতারের বেড়ার ওপরে উঠে ঝাঁপ দেয়। সেখানে সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার হয়েছিল। কিন্তু ওই মেয়েটি কাঁটাতারের এপারে পড়েই ছিল। হয়তো পরিকল্পনা ছিল, তাঁর ছবি তোলা হবে, ভিডিও করা হবে। তারপর সেই ছবি ও ভিডিও দিয়ে সে বা তাঁর দলবল ব্ল্যাকমেইল করবে। কিন্তু কিন্তু মহিলা পুলিশ আর মহিলা আর্মি এসে টেনেহিঁচড়ে তুলে তাঁকে আর্মির জিপে করে নিয়ে যায়। রাষ্ট্রপতির দাবি, ওই রাতটা আমার জন্য ছিল বিভীষিকাময়। এই যে ফ্লাইওভার, এই ফ্লাইওভার দিয়ে ওই পেছনে, ওদিকে খালি ঠেলাগাড়ি, ভ্যান, কাভার্ড ভ্যান দিয়ে চারদিকে ছিন্নমূল লোকজন আসে। গণভবনের মতো বঙ্গভবনও লুট করতে চেয়েছিল। আমরা তো ঘরেই ছিলাম। আমাদের তো আর কিছু নেই, এখান থেকে তো আমি পালাব না, তাই না? কিন্তু সেদিন সেনাবাহিনী খুব দৃঢ়তার সঙ্গে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। রাষ্ট্রপতি এও দাবি করেন, আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ওই কঠিন সময়েও বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব আমার পাশে ছিলেন। তাঁরা তখনো সংবিধানের ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি আমার কাছে স্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঘিরে আমার মনের মধ্যে অনেক কৌতূহল জমা ছিল। কিন্তু আমি পর্যায়ক্রমে বুঝতে পারলাম, তিনি খুবই আন্তরিকতাপূর্ণ মানুষ। হি ওয়াজ সো কর্ডিয়াল! আমার দুঃসময়ে বিএনপির সহযোগিতা শতভাগ ছিল। অর্থাৎ, সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর এই সাক্ষাৎকার অনেক তাৎপর্যপূর্ণ। রাজনৈতিক মহলের মতে, মুহাম্মদ ইউনূস যে তাঁকে অপসারণের নানা পরিকল্পনা করেছিলেন, তা যেমন খোলসা করলেন রাষ্ট্রপতি, তেমনই বিএনপির সাহায্যের কথা বলে তিনি বুঝিয়ে দিলেন বাস্তব পরিস্থিতি।












Discussion about this post