ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পালাবদল ঘটেছে। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে সেই তথাকথিত গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তৎকালীন নির্বাচিত সরকার আওয়ামী লীগকে হটিয়ে বাংলাদেশের ক্ষমতা হাতে নিয়েছিলেন নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস। এরপর দেড় বছরের একটু বেশি সময় তিনি বাংলাদেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। এখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিএনপি’র চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যে কোনও রাজনৈতিক পালাবদলের পর প্রশাসনিক ও সামরিক রদবদল হয়েই থাকে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারও বেশ কিছু ক্ষেত্রে রদবদল করছে। এরমধ্যে সামরিক রদবদলও হচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের ভবিষ্যৎ কি অনিশ্চিত? তাকে কি সরিয়ে দেওয়া হতে পারে?
এর উত্তর খোঁজার আগে আমরা বরং একটু ফিরে যাই ফ্ল্যাসব্যাকে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশ রাজনৈতিক পালা বদল ঘটে গিয়েছে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে গিয়েছিলেন। সেদিন সন্ধ্যায় বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দেন। তখন তাঁর দুই পাশে উপস্থিত ছিলেন নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধানরা। সেদিন জেনারেল ওয়াকার বলেছিলেন আজ থেকে বাংলাদেশের সমস্ত জনগণের জান মালের দায়িত্ব তার কাঁধে। এরপর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ শাহাবুদ্দিন যখন জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন তখনও তাঁর পিছনে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাংলাদেশের তিন বাহিনীর প্রধান। এরপর থেকে বিগত দেড় বছরে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জমানায় যতবারই এই পরিস্থিতির সামনে এসেছে ততবারই আমরা দেখেছি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান ও বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁন একসাথে প্রকাশ্যে এসেছেন। এমনকি তারেক রহমান বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এই তিনজন একসাথেই গিয়েছিলেন। সেটা ছিল ১৯ তারিখ। কিন্তু তাল কাটলো দুদিন পরেই। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আলাদা আলাদা করে বৈঠক করলেন বাংলাদেশ নৌ বাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল মোহাম্মদ নাজমুল হাসান এবং বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল হাসান মাহমুদ খাঁনের সঙ্গে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে বাদ গেলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান। এই ঘটনা রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলে যথেষ্ট শোরগোল ফেলেছে।
এর মধ্যেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ব্যাপক রদবদল করা হয়েছে। সে দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক সূত্রে খবর, রবিবার বিকেলেই এই সংক্রান্ত নির্দেশিকা জারি করেছে বাংলাদেশি সেনার সদর দফতর। তাতে দেখা যাচ্ছে বেশ কিছু পদে রদবদল হয়েছে। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বদলি হল, আর্মড ফোর্সেস ডিভিশনের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানকে বিদেশ মন্ত্রকে পাঠানো হয়েছে। জানা যাচ্ছে, কোনও দেশে রাষ্ট্রদূত হিসাবে নিযুক্ত করার জন্য তাঁকে বিদেশ মন্ত্রকে বদলি করা হয়েছে। ঘটনাচক্রে এই সেনা আধিকারিক মুহাম্মদ ইউনূসের জামানায় বিশেষ সুবিধা ভোগ করছিলেন। বাংলাদেশ সেনার নতুন প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার করা হয়েছে মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমানকে। তিনি এত দিন পদাতিক বাহিনীর ২৪তম ডিভিশনে ছিলেন। জানা যাচ্ছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এসএম কামরুল হাসানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের “অপেক্ষারত রাষ্ট্রদূত” হিসেবে বিদায় জানানো হয়েছে। এটা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এক সিদ্ধান্ত। কারণ, পদাতিক বাহিনীর ২৪তম ডিভিশনের জিওসি লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের অনুগত বলেই পরিচিত। যাকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের স্থলাভিসিক্ত করা হল। জানা যায় লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিদায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ট। ফলে তাকে বিদেশ মন্ত্রকে সরিয়ে দেওয়া খলিলুর রহমানের জন্য বাড়তি চাপ বলেই মনে করা হচ্ছে। আরও একটি বিষয় সামনে আসছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসান মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে “মানবিক করিডোর” এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন।
ফলে লেফটেন্যান্ট জেনারেল কামরুল হাসানের বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অপসারণ খলিলুর রহমানের জন্য কঠিন পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ সেনার নতুন চিফ অফ জেনারেল স্টাফ করা হয়েছে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মইনুর রহমানকে। তিনি এত দিন বাংলাদেশি সেনার আর্মি ট্রেনিং অ্যান্ড ডকট্রিন কমান্ডে ছিলেন। অপরদিকে পদোন্নতি পেয়েছেন দিল্লিতে বাংলাদেশি হাইকমিশনে কর্মরত এক সেনাকর্তাও। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান এত দিন দিল্লিতে বাংলাদেশি হাই কমিশনে কর্মরত ছিলেন। তাঁকে পদোন্নতি দিয়ে মেজর জেনারেল করা হয়েছে। এছাড়া আরও কয়েকটি পদে রদবদল হয়েছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুহাম্মদ ইউনূসের আমলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি অংশকে কাজে লাগিয়ে সেনাবাহিনীতে যেভাবে পাকিস্তান ও চিনের উপস্থিতি সামনে আনা হচ্ছিল তা তারেক রহমানের সরকার পাল্টে ফেলতে চাইছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে কার্যত হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছে চীন বা রাশিয়া থেকে যাতে কোন প্রতিরক্ষা চুক্তি না হয়। সাম্প্রতিক এই রদবদল সেই দিকেই ইঙ্গিত করছে। এখানেই প্রশ্ন উঠছে এতদিন চোখ বন্ধ করে বসে থাকা সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে কি ছাড় দেওয়া হবে? বাংলাদেশ রাজনৈতিক মহলে জেনারেল ওয়াকারকে জামাতপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তাই শেষ বেলায় তারেক রহমান বাংলাদেশের নৌ ও বিমান বাহিনীর প্রধানদের সঙ্গে বৈঠক করলেও জেনারেল ওয়াকার কে ডাকেননি। যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তাহলে কি জেনারেল ওয়াকার উজ জামানের জন্য বিপদঘন্টি বাজছে?












Discussion about this post