বাংলাদেশের রাজনীতি বড়ই অদ্ভুত। দীর্ঘকালীন সময়ে ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুটি রাজনৈতিক দল কার্যত ক্ষমতা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। আবার বাকি সময় হয় সেনাশাসন না হয় কোনও অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ছিল বাংলাদেশ। এই দুটি রাজনীতিক দল হল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ ন্যাশনাললিস্ট পার্টি বা বিএনপি। কিন্তু ২০২৬ সালের ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন অনেক কিছুই বদলে দিয়েছে। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ না থাকার সুযোগে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ বিরোধী দলের মর্যাদা পেয়েছে। তাদের পক্ষে আসন সংখ্যা সুবিধাজনক না হলেও এক-তৃতীয়াংশ দখল করে একটি শক্তিশালী বিরোধীপক্ষ হওয়ার মতো জায়গায় আছে। জামাতের ঝুলিতে রয়েছে ৬৭ আসন, জোটসঙ্গীদের ধরে ৭৭ আসন। এই সংখ্যা একটি শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দলের জন্য যথেষ্ট। এখন প্রশ্ন উঠছে জামাত এই প্রথম বিরোধী আসনে বসলো। তাঁরা কি পারবে সত্যিকারের বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে?
গত ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে নির্বাচন হয়েছে পরদিন থেকেই ফলাফল প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল। চূড়ান্ত ফল ঘোষণার পর দেখা গেল আওয়ামী লীগবিহীন এই নির্বাচনে জামাত প্রধান বিরোধী দল হিসেবে উঠে এসেছে। যদিও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা ছিল জামাত আরও ভালো ফল করবে। কিন্তু দীর্ঘ কয়েক বছর বিএনপি’র ছত্রছায়া থাকা জামায়াতে ইসলামী সেই জায়গা ধরে রাখতে পারেনি। তাদের জোট ৭৭ আসনেই সীমাবদ্ধ রয়ে গিয়েছে। আসন্ন সাংসদদের প্রথম অধিবেশনে জামাত কি ভূমিকা নেয় সেটাই এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের নজরে রয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী দেড় বছরে জামাত কার্যত মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পর্দার আড়াল থেকে পরিচালনা করেছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন তাঁরা এত দ্রুত হোক চাননি। কিন্তু আন্তর্জাতিক চাপে মুহাম্মদ ইউনূসকে এই নির্বাচন করাতে হয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বহু চেষ্টা করেছিল যাতে তারেক রহমান দেশে না ফেরেন। জামাত প্রধান ডক্টর শফিকুর রহমান লন্ডনেও উড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু কাজের কাজ হয়নি, ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরেন। এটাই ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির টার্নিং পয়েন্ট। জামায়াতকে বাংলাদেশের ক্ষমতায় বসানোর জন্য সমস্ত পরিকল্পনা কার্যত সারা হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারেক রহমান দেশে ফেরায় বিএনপির দিকে হাওয়া ঘুরে যায়। শেষ মুহূর্তে জামায়াতের নেতৃত্ব বুঝেছিল ভারতকে দূরে ঠেলে বাংলাদেশের ক্ষমতা দখল করা অসম্ভব। কিন্তু ততক্ষণে খেলা ঘুরে গিয়েছে, তারেক রহমান দেশে ফিরলেন তারপর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া প্রয়াত হলেন। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ছুটে গেলেন ঢাকায়। ইঙ্গিত ছিল স্পষ্ট ভারত এবার বিএনপির দিকেই বাজি ধরেছে। ভোটের ফলাফল সেভাবেই হল। কূটনৈতিক লড়াইয়ে মাত দিয়ে গেল ভারত। আঙ্গুল চুষছে জামাত। ভারত সরকার কখনোই চাইনি বাংলাদেশের ক্ষমতায় আসুক জামায়াতে ইসলামীর মত পাকিস্তানপন্থী কোনও রাজনৈতিক দল। ফলে খেলাটা হয়েছে অন্য জায়গায়। এখন বাংলাদেশে ক্ষমতায় রয়েছে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার। আর বিরোধী আসনে জামায়েত জোট।
ফলে প্রশ্ন উঠছে এই পরিস্থিতিতে জামায়াত কি ভূমিকা নেবে? এখনও পর্যন্ত যা বোঝা যাচ্ছে জামায়াত নেতৃত্ব তাঁদের ভূমিকা পরিবর্তন করেছে। জামায়াত বুঝে গিয়েছে, তাঁদের সংখ্যা নিয়ে তাঁরা সরকার পরিবর্তন করতে পারবে না। কিন্তু তাঁরা প্রকৃত বিরোধীদের মতো সরকারকে বিড়ম্বনায় ফেলতে পারে। যেটা জানা যাচ্ছে, জামায়াত জোট এবার তাঁদের ভূমিকা পরিবর্তন করতে চলেছে। তাঁরা বিরোধী আসনে বসে সরকারপক্ষকে ক্রমাগত চাপে রাখতে চাইছে। প্রতিটি আলোচনা, বিতর্কে সরকারকে কোনঠাসা করতে চাইছে জামায়াত শিবির। এবার তাঁদের লক্ষ্য, বাংলাদেশের চলতি সংসদ অধিবেশনে সরকারপক্ষকে প্রশ্নে এবং যুক্তিতে বিদ্ধ করা। প্রসঙ্গত, এর আগে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলিকে বরাবর দেখা গিয়েছে তাঁরা সংসদ বর্জন করে রাস্তায় নেমে প্রতিরোধ করা, বিক্ষোভ ও আন্দোলনের মাধ্যমে রাস্তায় নেমেই সরকারের বিরোধিতা করতে। কিন্তু জামায়াত সেই রাস্তায় হাঁটছে না। তাঁরা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে প্রকৃত বিরোধীদের মতো এবার সংসদের অভ্যন্তরেই বিরোধিতা করার কথা ভাবছে। জামায়াতের এই বিবর্তন এমনি হয়নি, গত গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের নতুন প্রজন্ম যেভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, তা দেখেই জামায়াত তাঁদের কৌশল বদল করেছে বলেই দাবি ওয়াকিবহাল মহলের। আর এটা “স্লো অ্যান্ড স্টেডি” রাজনীতি বলেই মনে করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। কারণ, জামায়াত বুঝতে পেরেছে, এবার হয়নি তো, পরের বার হবে।












Discussion about this post