ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ওসমান হাদির হত্যায় অন্যতম প্রধান অভিযুক্ত ফয়সাল মাসুদ করিম। তাঁকে সহ আরও এক অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে রাজ্য পুলিশের এসটিএফ। তাঁদের ধরা হয়েছে ভারত-বাংলাদেশের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে। প্রসঙ্গত, ২০২৫ সালে ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় প্রকাশ্যেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল তরুণ রাজনৈতিক কর্মী তথা ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক সরীফ ওসমান হাদিকে। তাঁর মৃত্যুর পর গোটা বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে ওঠে। তখন ছিল মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনকাল। সরকারপক্ষ, পুলিশ ও ছাত্রনেতারা সে সময় প্রকাশ্যেই হাদির হত্যার জন্য ভারতকে দায়ী করেন। উন্মত্ত জনতা ভারতীয় দূতাবাসগুলিতে হামলা চালায়। দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক সবচেয়ে তলানিতে চলে যায়। সে সময়ই ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, হাদির হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল মাসুদ করিম ভারতে পালিয়ে গিয়েছে। একবার এ দাবিও করা হয়েছিল কলকাতা পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করেছে। কিন্তু পরবর্তী সময় এই ফয়সাল করিম দুবাই থেকে ফেসবুক লাইভ করে দাবি করেছিলেন তিনি নির্দোষ। এরপর ধীরে ধীরে হাদি হত্যা মামলা নিয়ে উত্তেজনা স্থিমিত হয়ে যায়। বাংলাদেশে নির্বাচন হয়ে গিয়েছে, নতুন বিএনপির সরকার ক্ষমতায় বসেছে। সেই সঙ্গে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হচ্ছে। এই আবহেই আচমকা পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স হাদি হত্যায় জড়িত মূল অভিযুক্ত ফয়সাল করিম ও আলমগির হোসেনকে গ্রেফতার করল। যা নিয়ে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে দুই দেশের মধ্যে।
ফয়জল পটুয়াখালির বাসিন্দা এবং আলমগিরের বাড়ি ঢাকায় বলে জানা গিয়েছে। ওসমান হাদিকে খুনের পর এই দুই অভিযুক্ত মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেছিল বলে খবর এসটিএফ সূত্রে। তাঁরা মেঘালয় দিয়ে ভারতে ঢুকে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেরিয়েছিল। এবার তাঁরা বনগাঁ সীমান্ত দিয়ে গোপনে ভারত ত্যাগ করে বাংলাদেশ পালানোর ছকে ছিল। সেই উদ্দেশ্যেই ফয়সাল ও আলমগীর বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিল। গোপনসূত্রে এ খবর জানতে পারে রাজ্য পুলিশ। এরপরই শনিবার গভীর রাতে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ অভিযান চালিয়ে দুজনকে পাকড়াও করে। এমনই দাবি পুলিশের। রবিবার তাঁদের আদালতে হাজির করিয়ে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।
যদিও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এসটিএফ এক বিবৃতি জারি করে বলেছে, গোপন সূত্রে খবর ছিল খুন ও তোলাবাজিতে জড়িত দুই বাংলাদেশি যুবক দেশ থেকে পালিয়ে এসে বনগাঁ সীমান্ত এলাকায় এসে লুকিয়ে রয়েছে। বর্তমানে তাঁরা ফের সীমান্ত পার করে দেশে ফেরার চেষ্টা চালাচ্ছে। ওই খবরের উপরে ভিত্তি করেই বিশেষ অভিযান চালানো হয়। তাতেই গ্রেফতার হয়েছে রাহুল ওরফে ফায়সাল করিম মাসুদ ও আলমগীর হোসেন নামে দুই যুবক। অর্থাৎ, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের কাছে ওসমান হাদি হত্যাকারীদের সম্পর্কে খবর ছিল না, অন্য একটি সূত্র ধরে এই অভিযান চালানো হয়েছিল। পরে পুলিশ জানতে পারে এরাই ওসমান হাদি খুনে মূল অভিযুক্ত। উল্লেখ্য, ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান হাদির ভোটে লড়া করার কথা ছিল ঢাকা–৮ আসন থেকে। এর জন্য তিনি প্রচার শুরু করেছিলেন। সে সময়ই গত ১২ ডিসেম্বর তাঁকে পুরানো পল্টনের কালভার্ট রোডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের দাবি, হাদি হত্যায় মূল অভিযুক্ত এই দুজনের সঙ্গে কনস্যুলার অ্যাক্সেস বা সাক্ষাতের আবেদন জানিয়েছে কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ-হাইকমিশন। কলকাতায় অবস্থিত বাংলাদেশ উপ হাইকমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে আটক দুজনের সঙ্গে কনস্যুলার সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, সাধারণত এ ধরনের আবেদন প্রক্রিয়াকরণে তিন থেকে সাত কার্যদিবস সময় লাগে এবং আশা করা হচ্ছে আগামী সপ্তাহের মধ্যেই সাক্ষাতের ব্যবস্থা করা হবে। কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই গ্রেপ্তারের ফলে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে মামলার তদন্তে আরও আইনি সহযোগিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তি প্রয়োগের কথাও বিবেচনা করা হতে পারে। যদিও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ এই দুই সন্দেহভাজনকে গ্রেফতার করায় অনেকগুলি প্রশ্ন সামনে চলে এল। ভারত বিরোধী জঙ্গিরাও পশ্চিমবঙ্গকে নিরাপদ বলে বেছে নিয়েছে এমন অভিযোগ করা হচ্ছিল। এমন প্রেক্ষাপটে ইউনূসের আমলে তোলা অভিযোগই প্রমাণিত হল হাদি হত্যায় দুই অভিযুক্ত পশ্চিমবঙ্গ থেকেই গ্রেফতার হওয়ায়।












Discussion about this post