বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে আরও ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ পদে রদবদল আনা হয়েছে। সেনা সদর থেকে এই রদবদল নিয়ে একটি আদেশ জারি করা হয়েছে। এর আগেও সেনাবাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে আরো ৮টি পদে রদবদল আনা হয়েছিল। বদলি হওয়া সেনা কর্মকর্তারা হলেন ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের (এনডিসি) কমান্ড্যান্ট লে. জেনারেল মোহাম্মদ শাহীনুল হককে কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) করা হয়েছে। কিউএমজির দায়িত্ব পালন করা আসা লে. জেনারেল ফয়জুর রহমানের স্থলাভিষিক্ত হবেন লে. জেনারেল শাহীন। লে. জেনারেল ফয়জুরকে এনডিসিতে বদলি করা হয়। এ ছাড়া সামরিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের (এমআইএসটি) মেজর জেনারেল মো. নাসিম পারভেজের চাকরি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়েছে।মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন আল মোরশেদকে ১৯ পদাতিক ডিভিশন থেকে সেনাবাহিনীর অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল (এজি) করা হয়েছে। এ ছাড়া অ্যাডজুট্যান্ট জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসা মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হাকিমুজ্জামানকে এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট করা হয়। ৬৬ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মোহাম্মদ কামরুল হাসানকে লজিস্টিক এরিয়ার জিওসি হিসবে বদলি করা হয়।বদলিতে চিফ অব জেনারেল স্টাফ বা সিজিএস পদে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাইনুর রহমান। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের বর্তমান প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে রাষ্ট্রদূত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হয়। এই পদে আসেন মেজর জেনারেল মীর মুশফিকুর রহমান।
অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ইউনূস ক্ষমতা থাকাকালীন তাঁর সঙ্গে সেনাপ্রধানের বিরোধ ক্রমশ বাড়তে বাড়তে এমন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে রাজপথ স্লোগান উঠেছিল ওয়াকার না হাসনাত। জামাতের অফশ্যুট এবি পার্টির ব্যারিস্টার ফুয়াদ প্রকাশ্য সভায় সেনাপ্রধানকে কদর্য ভাষায় গাল দেন। ওয়াকারকে ‘কুকুর’ বলে সম্বোধন করতে তাঁর জিভ জড়িয়ে যায়নি। তবে মুহাম্মদ ইউনূস জেনারেল ওয়াকারের বিরুদ্ধে কুকথা বলেননি ঠিকই। কিন্তু সেনাপ্রধানের ডানা ছাঁটার সেই সঙ্গে তাঁকে উত্যক্ত করতে নানা ধরনের ছক কষেন। বাংলাদেশে আগে জাতীয় উপদেষ্টা বলে কোনও পদ ছিল না। পূর্বতন তদারকি সরকার সেই পদ তৈরি করে খলিলুর রহমানকে ওই পদে নিয়োগ করে। বলা হচ্ছে খলিলকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদে নিয়োগ করে ইউনূস সেনাপ্রধান ওয়াকারের ক্ষমতা হ্রাস করেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালে সেনা বাহিনীর বেশ কয়েকজন কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যদের বিচারের আওতায় আনার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন পূর্বতন সরকার প্রধান। এই সিদ্ধান্তে সেনপ্রধানের তীব্র আপত্তি ছিল। সেনাবাহিনীর ভিতরে জামায়াতপন্থীরা ক্ষমতা প্রায় দখল করে নিয়েছিল। তাদের পিছনে ছিল পাকিস্তান, তাদের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই। আর ছিল আমেরিকার সমর্থনও। আমেরিকা যে অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষের দিকে তারা জামাতের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। আমেরিকা ধরে নিয়েছিল যে জামায়াত বাংলাদেশে ক্ষমতা দখল করতে চলেছে। এর ফলে বিপদে পড়েছিলেন সেনাপ্রধান ওয়াকার, সঙ্গে তাঁর বাহিনীও। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাবাহিনীতে রদবদল দেখে বোঝা যাচ্ছে ইউনূসের বিদায় ও বিএনপির বিজয়ের ফলে জেনারেল ওয়াকার তাঁর শক্তি ফিরে পেয়েছেন। আর সেই শক্তির ব্যবহারও করছেন। তিনি তারেক রহমানের সঙ্গে একটা গোপন বোঝাপড়ায় এসে গিয়েছেন। আর সেই বোঝাপড়ার ফলে সেনার ভিতরে তাঁর শত্রুদের বলা ভালো, যাঁরা তাঁর ঘনিষ্ঠ নন, তাদেরকে তাদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সেই সব পদে সেনাপ্রধান নিয়োগ করেন তাঁর ঘনিষ্ঠদের। কয়েকজনকে বদলি করে দিয়েছেন।
দীর্ঘ ১৮ মাসের প্রশাসনিক অস্থিরতা ও সেনাবাহিনীর ভিতরে টানাপোড়েন। যার অবসান ঘটিয়ে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ফিরে পেলেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ্জামান। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা তিনি ভেঙে দিয়েছেন। শীর্ষপদে এনেছেন রদবদল। এর মাধ্যমে তিনি কম্যান্ড পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছেন জেনারেল ওয়াকার। বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলামকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এখনও একটি বড়ো বাধা রয়ে গিয়েছে। লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়জুর রহমান এখন তাঁর পদে বহাল রয়েছেন। সেটাই সেনপ্রধান ওয়াকারে পথের কাঁটা।












Discussion about this post