ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসেছিল গত ১২ মার্চ। প্রথম দিন সংসদ সাক্ষী থাকল নানা ঘটনা প্রবাহের। বিউগলে বাজছিল জাতীয় সংগীত। নিয়ম অনুযায়ী, জাতীয় সংগীত বাজলে উঠে দাঁড়াতে হয়। এই নিয়ম সব দেশেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে দেখা যায় জামায়াত এবং এনসিপির সংসদ সদস্যরা আসনে বসে রয়েছেন। মির্জা ফকরুল ইসলাম আলমগীর তাদের উঠে দাঁড়াতে বলছেন। রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর দেহরক্ষীও তাদের উঠে দাঁডা়তে নির্দেশ দিচ্ছেন। কিন্তু জামায়াত এবং এনসিপি সংসদ সদস্যরা দাঁড়াতে অস্বীকার করেন। জাতীয় সংগীত প্রায় শেষ হওয়ার মুখে। সেই সময় বিরোধীদলের সদস্যরা উঠে দাঁড়ালেন। এখানেই শেষ নয়। রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু যখন ভাষণ দিচ্ছিলেন, সেই সময় তাদের দেখা গেল স্লোগান দিতে। বিরোধী দলের অধিকাংশ সদস্যের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। তারা শেষ পর্যন্ত সভা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে সংসদের বাইরে তারা সাংবাদিকদের বলেন, রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তারা যুক্তি সংগত কারণেই স্লোগান দিয়েছেন।
জামাতের বক্তব্য রাষ্ট্রপতি চুপ্পু অতীতে সংঘঠিত হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেননি। অথচ তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবক। দ্বিতীয় অভিযোগ, ২০২৪-য়ের ৫ অগাস্ট জাতির উদ্দেশ্য দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন। তিনি সেই পদত্যাগ পত্র গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেটা অস্বীকার করেন। এতে তিনি জাতির প্রতি মিথ্যাচার করেছেন। জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে জামায়াতে আমিরের তৃতীয় অভিযোগ, জুলাই অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য – এই দুই ভূমিকায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি একাধিক অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশের এক মাসের মধ্যে সংস্কার পরিষদের আহ্বান করার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতি তা করেননি।
এই রাষ্ট্রপতিকে নিয়োগ হয়েছিলেন হাসিনা সরকারের আমলে। অথচ সংসদে রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে আওয়ামী লীগের কড়া সমালোচনা করেন। ফলে, তাঁর ভাষণ মেনে নিতে পারেনি আওয়ামী লীগও। দলের অনেকে তাঁকে মীরজাফর বলেছেন। বলার কারণও রয়েছে। হাসিনা সরকারকে তিনি ফ্যাসিবাদী সরকার বলে মন্তব্য করেন। মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করতে গিয়ে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পু বলেন, “স্বাধীনতার ঘোষক শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীরোত্তম স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সকল অবিসংবাদিত নেতাকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। ”রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, রাষ্ট্রপতি যদি কেবল বলতেন মুক্তিযুদ্ধের যত নেতা আছেন, তাদের প্রত্যেককে তিনি স্মরণ করছেন। শ্রদ্ধা নিবেদন করছেন, তাহলে এত বিতর্ক তৈরি হত না। কিন্তু তিনি জিয়াউর রহমানের নাম আলাদা করে স্মরণ করায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন উঠছে মুক্তিযুদ্ধের নেতা কি একা জিয়াউর রহমান? স্বাধীনতা যুদ্ধে অনেকে লডা়ই করেছেন। তাদের মধ্যে থেকে শুধু একজনের প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করায় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রপতি আরও বলেছেন, আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছিল।
আওয়ামী লীগের অসন্তোষ এখানেই। তাদের দৌলতেই তো সাহাবুদ্দিন চুপ্পু রাষ্ট্রপতি পদে আসীন হতে পেরেছিলেন। তবে এই প্রথম যে তিনি উল্টো পথে হাঁটলেন তা নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের একটি গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতির মুখে শোন যায় বিএনপির প্রশংসা। রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিক তো বটেই। সেই সঙ্গে এটাও বলা প্রয়োজন যে তাঁকে হতে হবে নিরপেক্ষ। তিনি বিশেষ কোনও রাজনৈতিক দলের পক্ষ নিতে পারেন না। কিন্তু কার্যক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন চুপ্পুকে দেখা গেল বিএনপির পক্ষ নিতে। একটি রাজনৈতিক দলের কর্মী যে ধরণের আচরণ করে থাকেন, একজন রাষ্ট্রপতি সেই ধরনের আচরণ করতে পারেন না। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, রাষ্ট্রপতিকে রাজনৈতিক দলগুলি দলের ভিত হিসেবে ব্যবহার করে থাকে। বিএনপি সেটাই করেছে।












Discussion about this post