আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা দিন। এরপরই মহাসপ্তমী থেকে শুরু হয়ে যাবে মা দুর্গার অঞ্জলী। যদিও অপামর বাঙালি মহাষ্টমীতেই অঞ্জলী দেয়, তবে পুজোর চারদিনই অঞ্জলী দেওয়া যায়। এই সময় আমরা হাতজোর করে বলবো, ॐ সৃষ্টিস্থিতি বিনাশানাং শক্তিভূতে সনাতনী। গুণাশ্রয়ে গুণময়ে নারায়ণী নমোহস্তুতে। আচ্ছা বলুন তো, দুর্গাপুজোর মন্ত্রে নারায়ণীকে কেন প্রণাম করতে হয়? শিব পত্নী দেবী দুর্গাকে এখানে আমরা বলছি নারায়ণী। আসুন এই বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক।
শঙ্খ-চক্র-গদা-শার্ঙ্গ-গৃহীত-পরম-আয়ুধে। প্রসীদ বৈষ্ণবী-রূপে নারায়ণি নমহস্তুতে। মার্কেণ্ডেয় পুরাণের শ্রী শ্রী চণ্ডীর এই শ্লোকগুলি আমরা মহালয়ার ভোরে বীরেন্দ্র কৃষ্ণের উদ্বাত কণ্ঠে শুনে আসছি যুগ যুগ ধরে। যতবারই শুনি, ততবারই মনে একটা প্রশ্ন জাগে, কেন দেবী দূর্গাকে নারায়ণী বলা হচ্ছে তাঁর প্রণাম মন্ত্রে। কেনই বা শিব পত্নী হয়ে তিনি নারায়ণী, আদৌ কি তিনি ভগবান বিষ্ণু বা নারায়ণের কোনও অংশ? আমরা দেখেছি, মণ্ডপে মণ্ডপে দুর্গা প্রতিমার চালচিত্রের ঠিক মাঝখানে শিবের মুখটা বড় করে থাকে। কিন্তু দেবী দুর্গাকে এখানে আমরা বলছি নারায়ণী। অর্থাৎ নারায়ণের অংশসম্ভূতা। শ্রী শ্রী চণ্ডীর প্রথমার্ধে আমরা দেখি, সর্বমঙ্গল মঙ্গল্যে শিবে সর্বার্থসাধিকে,শরণ্যে ত্রম্বক্যে গৌরী নারায়ণী নমোহস্তুতে। অর্থাৎ, যিনি সর্বমঙ্গলদায়িনী, সর্ব অর্থ সাধিনী, সেই শিবা ত্রম্বকা গৌরী নারায়ণীকে প্রণাম করি। এই শ্লোকে দেবীবন্দনায় যুক্ত হয়েছে শিব শব্দটির স্ত্রীলিঙ্গ, শিবে। আবার একই সঙ্গে দেবীকে বলা হয়েছে গৌরী এবং নারায়ণী। তাহলে ব্যাপারটা কী হল?
শ্রী শ্রী চণ্ডীর শ্লোকগুলিতে আমরা শিবের কথা পাই, গৌরীর কথা পাই। আবার প্রতিবারই তাঁকে নারায়ণী বলে প্রণাম করি। শ্রাস্ত্রকারেরা বলেন, শিব অর্থাৎ যিনি জগতের মঙ্গল সাধন করেন। সেই জন্যই দেবী শিবা, অর্থাৎ তিনি এখানে শিবপত্নী নন। তিনি তপ্তকাঞ্চনবর্ণা, অর্থাৎ অত্যন্ত ফর্সা! তাই তিনি গৌরী। এবং নারায়ণের অংশসম্ভূতা, কাজেই তিনি নারায়ণী। এই শ্লোকগুলির একটি অংশে আমরা পড়ছি, যে দেবী শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারিণী, সেই নারায়ণীকে আমরা প্রণাম করি! এবার বলুন তো, এই শঙ্খ-চক্র-গদা-পদ্ম ধারী আসলে কে? ভগবান বিষ্ণু বা নারায়ণ। তাই দেবী এখানে নারায়ণী। ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ বলছে, জগতে প্রথম দুর্গার আরাধনা করেন ভগবান শ্রী কৃষ্ণ। সৃষ্টির প্রথম যুগে পরমাত্মা কৃষ্ণ আদি-বৃন্দাবনের মহারাসমণ্ডলে প্রথম দুর্গাপূজা করেন। তিনিই যোগমায়া বা যোগনিদ্রা দেবী। শুরু থেকেই দেবী দুর্গা এবং দুর্গাপূজার সঙ্গে রয়েছে বিষ্ণু এবং তাঁর অবতারদের প্রত্যক্ষ যোগ। শ্রীমদ্ভাগবত গীতায় উল্লেখ রয়েছে, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মায়াদেবী অর্থাৎ যোগমায়াকে এই বলে আশীর্বাদ করেছিলেন– পৃথিবীতে মানুষেরা বিভিন্ন স্থানে তোমার দুর্গা, ভদ্রকালী, বিজয়া, বৈষ্ণবী, কুমুদা, চণ্ডিকা, কৃষ্ণা, মাধবী, কন্যকা, মায়া, নারায়ণী, ঈশানী, শারদা, অম্বিকা প্রভৃতি নামকরণ করবে।
শ্রীশ্রীচণ্ডীর প্রথম অধ্যায়ে বলা হয়েছে, প্রলয়কালে পৃথিবী এক বিরাট কারণ-সমুদ্রে পরিণত হলে বিষ্ণু সেই সমুদ্রের উপর অনন্তনাগকে শয্যা করে যোগনিদ্রায় মগ্ন হলেন। এই সময় বিষ্ণুর কর্ণমল থেকে মধু ও কৈটভ নামে দুই দৈত্য নির্গত হয়ে বিষ্ণুর নাভিপদ্মে স্থিত ব্রহ্মাকে বধ করতে উদ্যত হল। ভীত হয়ে ব্রহ্মা বিষ্ণুকে জাগরিত করবার জন্যে যোগনিদ্রার স্তব করতে লাগলেন যা কি না দ্বিতীয় দুর্গা পূজা হিসেবে উল্লিখিত। মহালয়ায় আমরা শুনেছি, বিষ্ণু পাঁচ হাজার বছর যুদ্ধ করেও মধু-কৈটভকে বধ করতে পারেননি। তখন এই দুর্গা, মতান্তরে যোগনিদ্রা বা যোগমায়া দুই দৈত্যকে মোহাচ্ছন্ন করলেন। তারা প্রার্থনা করল বিষ্ণুর হাতে নিজেদের মৃত্যু! এভাবেই দেবীর সাহায্যে মধু-কৈটভকে বধ করতে সক্ষম হলেন বিষ্ণু। এই ঘটনার পর থেকে বার বার আমরা বিষ্ণু এবং তাঁর অবতারদের সঙ্গেই দুর্গার নিবিড় যোগ আমরা দেখতে পাই। তিনিই বৈষ্ণবী, বিষ্ণুমায়া, নারায়ণী।












Discussion about this post