আওয়ামী লীগ, এই নামটাই যেন আতঙ্কের এক নাম বাংলাদেশের বর্তমান শাসকদের কাছে। আর আওয়ামী লীগ নেত্রী হলেন সাক্ষাৎ আতঙ্কের কারণ। কেন এমনটা বলা হচ্ছে? যেখানে মাত্র এক বছর আগেই এক বিশাল আন্দোলন ও গণ অভ্যেউত্থান ঘটিয়ে এই দলটাকেই তো বাংলাদেশ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। আর আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নেত্রী যিনি বাংলাদেশের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাঁকেও দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। কেউ কেউ আবার বলেন, তাঁকে গণভবনে হত্যার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু সামরিক বাহিনীর কোনও পদস্থ কর্তা তাঁকে সামরিক হেলিকপটার যোগে ভারতে পাঠিয়ে দেন। যাইহোক, এক বছরে কি এমন হল, যে বিপ্লবের সরকার হাসিনা আতঙ্কে ভুগছে? গণ অভ্যেউত্থানের এক বছরের মাথায় এই প্রশ্নটাই ঘুরেফিরে আসছে।
মুহাম্মদ ইউনূস, যিনি একজন নোবেলজয়ী, যিনি একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ ও আন্তর্জাতিক মঞ্চে যথেষ্ট জনপ্রিয়। তাঁকে বাংলাদেশের অভ্যেউত্থানের নায়করা অর্থাৎ ছাত্র নেতারা সমাদর করে ডেকে নিয়ে আসেন। তিনিও মাত্র ৭২ ঘন্টার মধ্যে সুদূর ফ্রান্স থেকে ঢাকায় পৌঁছে অন্তরবর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন। তারিখটা ছিল ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট। আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকদিন, তারপরেই ইউনূসের সরকার বর্ষপূর্তি পালন করবে। ঘটনা হল, প্রথমে বলা হয়েছিল এই সরকার দ্রুত সুষ্ঠ ও অবাধ নির্বাচন করিয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার গঠনে সাহায্য করবে এবং সেই সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে। আর সেটা তিনমাসের মধ্যেই করার কথা ছিল। কিন্তু সময় যত গড়িয়েছে, ততই বোঝা গিয়েছে ইউনূস সাহেবের আসল উদ্দেশ্য আরও বড়। তিনি যেনতেন প্রকারেন ক্ষমতায় থাকতে চান। আর তাঁকে যারা ক্ষমতায় এনে বসিয়েছিলেন, নেপথ্যে থাকা সেই সম্প্রদায়ও চায় ইউনূস সাহেব দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকুক। কারণ তাঁরা পিছন থেকে তাঁদের উদ্দেশ্য, স্বার্থ চরিতার্থ করতে পারবেন। ফলে যা হওয়ার হল, নানা আছিলায় মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচন নিয়ে টালবাহানা করতে থাকেন এবং এক বছর পার করিয়ে দেন প্রায়। এর মধ্যে বাংলাদেশের বুকে ঘটে গিয়েছে অনেক ঘটনা। বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি বিজড়িত ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ি ভাঙা থেকে শুরু করে মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে ধরে হেনস্থা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস মুছে ফেলার জন্য পাঠ্য পুস্তক বদল থেকে শুরু করে বিভিন্ন ঐতিহ্য, ভাস্কর্য বা স্মৃতিসৌধ ধ্বংস করা। হিন্দুদের ওপর অত্যাচার থেকে শুরু করে তাঁদের উপাসণালয়গুলি ধ্বংস করা। আবার মব জাস্টিসের নামে এক অদ্ভুত হিংস্র সংস্কৃতি আমদানি করে বাংলাদেশকে অরাজক করে তোলা আবার কট্টরপন্থী মুসলিম সংগঠনগুলিকে খোলা ছাড় দিয়ে জঙ্গি-জিহাদি প্রচার করতে দেওয়ার মতো ঘটনা এই শান্তির নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের রাজত্বেই ঘটেছে। এখানেই শেষ নয়, নিজে একজন স্বনামধন্য অর্থনীতিবিদ হয়েও বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পের ভবিষ্যত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছেন মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগ হল, নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে দেশকেই কার্যত বিক্রি করে দিচ্ছেন তিনি। তাঁর বিদেশনীতি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বাংলাদেশকে। ফলে সবমিলিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পর যে আশা ও ভরসার জায়গা তৈরি হয়েছিল, আজ তার কণামাত্র নেই বাংলাদেশে। সে দেশের জনগণও এখন মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর চূড়ান্ত ক্ষুব্ধ ও বিতশ্রদ্ধ।
অন্যদিকে ইউনূসকে যারা ক্ষমতার শীর্ষে বসিয়েছিলেন, সেই ছাত্র নেতারা এখন বাংলাদেশের বাঘ। তাঁরা যা ইচ্ছা তাই করছেন। তাঁদের দাপটে কার্যত কোনঠাসা হয়ে গিয়েছিল সমাজের একটা বড় অংশ। বৈষ্যম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন হোক বা হালফিলের জাতীয় নাগরিক পার্টি। এই ছাত্র নেতা ও সমন্বয়কদের দুর্নীতি, অত্যাচার ও চাঁদাবাজির দাপটে অতিষ্ট হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের আম জনতা থেকে শুরু করে সমাজের অন্য অংশ। সেই ক্ষোভও জমছে সকলের মনে। অন্যদিকে রয়েছে জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ। শেখ হাসিনার আমলে এই সংগঠন ছিল নিষিদ্ধ। ফলে জুলাই আন্দোলনে জামাত সবরকম ভাবে সাহায্য করেছিল ছাত্র জনতাকে। আজ তাঁরাই ইউনূস সরকারের মূল চালিকাশক্তি। পাকিস্তানপন্থী এই সংগঠন চাইছে বাংলাদেশকেও এক চরমপন্থী ইসলামিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে। সেই কারণেই বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান বদলে ফেলার জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে ইউনূস সরকারের ওপর। যা আজ ওপেন সিক্রেট।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের মধ্যেই আজ আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনার দাবি উঠতে শুরু করেছে। গণঅভ্যুত্থানের এক বছর হওয়ার আগেই বাংলাদেশের হাওয়া বদলে গিয়েছে। যারা আওয়ামী লীগকে স্বৈরাচারি বলে গালি দিতেন, তাঁরাই আজ বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে স্বৈরাচারি বলে তোপ দাগছেন। বাংলাদেশের আম জনতা আজ প্রকাশ্যেই বলছেন, ভাগ ইউনূস ভাগ, আওয়ামী লীগ আসতেছে।












Discussion about this post