গত বছর ৫ আগস্টে তাঁর সরকারের পতনের আগে বিগত ১৫ বছর ধরে বাংলাদেশকে শাসন করেছেন শেথ হাসিনা। তাঁর দল আওয়ামী লীগ আরও বেশ সময় বাংলাদেশে ক্ষমতায় ছিল। এমনকি আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম হোতাও বলা যায়। সেই রাজনৈতিক দলকে প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে নিষিদ্ধ করেছে মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। যা নিয়ে বিদেশি সংবাগমাধ্যমগুলি সরব হয়েছে। চাপ বাড়ছে ইউনূসের।
বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ নয়, তাঁদের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। খোদ লন্ডনে বসে আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এক সংবাদমাধ্যমকে এই দাবি করে এসেছিলেন বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। কিন্তু সেই লন্ডনেরই আরেক বিখ্যাত সংবাদ ম্যাগাজিন দ্য ইকোনোমিস্ট এক প্রতিবেদনে মুহাম্মদ ইউনূসকে কার্যত ধুঁয়ে দিলেন আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে। দ্য ইকোনমিস্ট এক দীর্ঘ প্রতিবেদনের হেডলাইন করেছে “বিরোধী দলকে নিষিদ্ধ করা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুজ্জীবিত করার কোন উপায় নয়”। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন ডিসি থেকে প্রকাশিত আরেক আন্তর্জাতিক সংবাদ ম্যাগাজিন দ্য ডিপ্লোম্যাট এই প্রসঙ্গে হেডলাই করেছে, “বাংলাদেশের আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা কি ন্যায়বিচারের দিকে একটি পদক্ষেপ নাকি গণতান্ত্রিক পশ্চাদপসরণ?” পাশাপাশি আল জাজিরা, ডিডব্লিউ, রয়টার্সের মতো একাধিক সংবাদমাধ্যমেও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সমালোচনা করা হয়েছে।
দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, আওয়ামী লীগের রেকর্ড খুবই খারাপ। কিন্তু ভোটারদের স্বাধীনভাবে নির্বাচন করার সুযোগ থাকা উচিত। পাশাপাশি তাঁরা এও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর যে উচ্ছ্বাস ছিল, তা সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নিভে যেতে মাত্র চার বছর সময় লেগেছিল। মুহাম্মদ ইউনূসের সমালোচনা করে দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, ক্ষুদ্রঋণের পথিকৃৎ এবং বর্তমান জাতীয় বীর মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, তারা দেশের গণতন্ত্র পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। প্রায় এক বছর পর, তাঁর নেতৃত্বে নতুন বাংলাদেশ ঝুলন্ত অবস্থায় রয়েছে। লন্ডনের ওই জনপ্রিয় সংবাদ ম্যাগাজিনের যুক্তি, বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার অর্থ হল গণতন্ত্রিক পদ্ধতিকেই চ্যালেঞ্জ করা। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-নেত্রী দুর্নীতিপরায়ন হতে পারেন। কিন্তু সকলে নন। পাশাপাশি যে কোটি কোটি সভ্য সমর্থক আওয়ামী লীগের প্রতি যে সমর্থন দিয়ে আসছে, এই নিষেধাজ্ঞা তাঁদের জন্য খুবই বেদনাদায়ক। দ্য ইকোনোমিস্টের দাবি, আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞায় বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই সমস্ত কোটি কোটি আওয়ামী সমর্থকদের অধিকার কেড়ে নিয়েছে।
অন্যদিকে, দ্য ডিপ্লোম্যাট লিখেছে, গত বছর বিপুল ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে এক গণ আন্দোলনের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন হয়। সেই আন্দোলনে অন্তত ১৪০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পরবর্তী সময় মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আওয়ামী লীগকেই নিষিদ্ধ করে। এই সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ওয়াকিবহাল মহলে বিভক্তি তৈরি করেছে। কারও কারও মতে, এই নিষেধাজ্ঞা গণ-দমনের অভিযোগে অভিযুক্ত সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী জবাবদিহিতার প্রতীক। অন্যদের মতে, এটি সম্মিলিত শাস্তির একটি বিপজ্জনক নজির স্থাপন করেছে। রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও গভীর করার ঝুঁকি তৈরি করেছে এবং বাংলাদেশের ভঙ্গুর গণতান্ত্রিক উত্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। দ্য ডিপ্লোম্যাট আরও লিখেছে, বাংলাদেশ পরবর্তী জাতীয় নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। যা ২০২৫ সালের শেষের দিকে বা ২০২৬ সালের প্রথম দিকে অনুষ্ঠিত হতে পারে। সেই নির্বাচনের আগে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে একটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল নৃশংস।
প্রসঙ্গত এতদিন ভারতীয় গণমাধ্যমে আওয়ামী লীগ সংক্রান্ত ইস্যুতে মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতিহিংসা এবং নিষেধাজ্ঞা চাপানো নিয়ে সমালোচনামূলক খবর ছাপা হতো। ঢাকার অভিযোগ, ভারতীয় গমমাধ্যম বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। কিন্তু এখন পশ্চিমা দেশগুলির এলিট সংবাদমাধ্যমও আওয়ামী লীগের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে সরব হচ্ছে। কারণ, সেই সমস্ত দেশের প্রশাসন এটাকে ভালো চোখে দেখছে না। ব্রিটেন, আমেরিকার মতো দেশগুলি বিরোধীদের কন্ঠরোধকে গণতন্ত্রের হত্যা হিসেবেই অভিহিত করেছে। সম্প্রতি ব্রিটেন সফরে গিয়ে মুহাম্মদ ইউনূস সে দেশের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারের সাক্ষাৎ পাননি। এবার সেই ব্রিটেনেরই ঐতিহ্যবাহী সংবাদ ম্যাগাজিন ইউনূসের প্রবল সমালোচনা করল। দেওয়াল লিখন স্পষ্ট, ইউনূস সাহেব কি পড়তে পারছেন?












Discussion about this post