গত বছরের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সে দেশের সংবাদমাধ্যম অদ্ভুতভাবে তাঁদের “পতিত স্বৈরাচারী” বলে আখ্যা দিতে শুরু করেছিল। ঠিক যেমনটা জামাত বা বৈষম্যবিরোধী ছাত্রনেতারা বলতেন। সেই ভাষায় কোনও সংবাদমাধ্যম যে লিখতে পারে সেটাই ছিল অষ্টম আশ্চর্য। যাইহোক, সমালোচনা শুরু হতেই সময়ের সঙ্গে এই অভ্যাস বদল করেছে বাংলাদেশের প্রথমসারির সংবাদমাধ্যমগুলি। এবার ঘটছে ঠিক উল্টো ঘটনা। দেখা যাচ্ছে প্রথম আলো বা মানবজমিনের মতো কয়েকটি সংবাদমাধ্যম আওয়ামী লীগের পক্ষে কথা বলছে। এটা কি তাহলে নবম আশ্চর্যের বিষয়?
ওয়াকিবহাল মহল বেশ কৌতূহলী, কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে দ্রুত একটা পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে তা কম তাৎপর্যপূর্ণ নয়। আওয়ামী লীগ এখন আর পতিত স্বৈরাচার নয়, বরং মুহাম্মদ ইউনূস সরকার ও তাঁর প্রত্যক্ষ দোসর যেমন এনসিপি নেতৃত্ব যে স্বৈরাচারী মনোভাব নিয়ে দেশ চালাচ্ছে তা সকলে স্পষ্ট বুঝে গিয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের মনোভাব পরিবর্তন হচ্ছে। ফলে আওয়ামী লীগের প্রতি যে বিদ্বেষ জন্মেছিল, তা ফিকে হতে শুরু করেছে। এর সুযোগ নিয়ে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব দেশের বাইরে থেকেও দলকে পুনরায় সংগঠিত করতে পেরেছেন। ফলে এখন বাংলাদেশ জুড়ে আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে ভালো লোকজনের ভিড় হচ্ছে, নেতা কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ভয়ও কমছে। এটা যেমন একটা দিক, অন্য দিকটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ।
আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতি থেকে নির্মূল হয়ে গিয়েছিল। বিগত প্রায় দেড় বছর তাঁদের সেভাবে অস্তিত্ব ছিল না রাজনীতির ময়দানে। এই সুযোগটা কাজে লাগাতে পারেনি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দল বিএনপি। তাঁরা ভেবেই নিয়েছিল ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন হবে আর তাঁরা সহজে জিতে ক্ষমতায় চলে আসবে। কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস তাঁদের সেই প্রত্যাশায় জল ঢেলে দিয়েছেন। তবে আওয়ামী লীগ না থাকার সুযোগ কাজে লাগিয়েছে জামায়তে ইসলামী বাংলাদেশ। তাঁরা ধীরে ধীরে বাংলাদেশ রাজনীতির জমি শক্ত করেছে। এখন এমন পরিস্থিতি, যে আগামী নির্বাচনে জামাত বিএনপিকেও ছাপিয়ে গিয়ে সবচেয়ে বড় দল হয়ে বিশ্বকে চমকে দিতে পারে। আর এটাই এখন পশ্চিমা বিশ্বের মাথাব্যাথার কারণ। জামাত সরাসরি বাংলাদেশের ক্ষমতায় চলে এলে কি হতে পারে তাঁর একটা ছোট ট্রেলার দেখাচ্ছে ইউনূসের অন্তরবর্তী সরকার। যার নেপথ্য নিয়ন্ত্রক সেই জামায়তে ইসলামী। ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি ইসলামিক দেশে পরিণত হচ্ছে। বাংলাদেশের প্রথমসারির সংবাদমাধ্যম এর অন্যতম কারণ হিসেবে আওয়ামী লীগের না থাকাকেই তুলে ধরছে। তাঁদের বক্তব্য, আওয়ামী লীগ ও তাঁর ১৪ দলের জোট এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কার্যত অস্তিত্বহীন হয়ে পড়েছে। এরই সুযোগ নিয়ে ইসলামিক দলগুলি তাঁদের প্রচার ও সংগঠন দুই বৃদ্ধি করেছে। ফলে জামাত বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক জমি শক্ত করে নিয়েছে।
সম্প্রতি একটি জনমত সমীক্ষা করেছে প্রথম আলো। তাতে যে তথ্য উঠে এসেছে সেই নিরীখে একটি প্রতিবেদন করেছে সংবাদমাধ্যমটি। যার শিরোনাম “নির্বাচনে আ.লীগকে চান না ২৮ শতাংশ, শর্তহীন ও শর্তযুক্তভাবে চান ৬৯ শতাংশ”। অর্থাৎ, বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষ যে ফের আওয়ামী লীগের দিকেই ঝুঁকছেন সেটাই বলতে চাইল প্রথম আলো। এই সমীক্ষার ফলাফলও বেশ মজার। প্রথম আলোর দাবি, সমীক্ষায় অংশ নেওয়া ২৮ শতাংশ মানুষ সরাসরি আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ গ্রহণে অসম্মত হয়েছে। আবার ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষের মতে বিনা শর্তেই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া উচিৎ। অর্থাৎ প্রায় সমান সমান। অন্যদিকে কিছুটা শর্ত চাপিয়ে বা ক্ষমা চাওয়ার শর্তে আরও কিছু সংখ্যক মানুষ আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের পক্ষে রায় দিয়েছেন। যেমন, ২৬ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, শাস্তি ও সংস্কার হলে আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ নিতে পারে। ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ মনে করেন, আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাইলে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে, শর্তহীনভাবে অথবা বিভিন্ন শর্তে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার পক্ষে ৬৯ দশমিক ২ শতাংশ। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, অপরদিকে প্রথম আলোর জরিপে আরেকটি তথ্যও বেশ চমকপ্রদ। সেটা হল, সবচেয়ে বেশি আসনে বিএনপি জয়ী হবে বলে মনে করেন দেশের বেশির ভাগ মানুষ। প্রায় ৬৬ শতাংশ মানুষের নাকি তাই মত। আবার জামাতের পক্ষে রায় দিচ্ছেন প্রায় ২৬ শতাংশ মানুষ। সবমিলিয়ে বিষয়টা গিয়ে দাঁড়াচ্ছে, বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দিকে। তবে যদি শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দলকে আসন্ন নির্বাচন থেকে দূরে রাখা যায়, তাহলে বিএনপি ও জামাতের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে। কিন্তু সেই নির্বাচন হয়তো বিশ্বের বেশিরভাগ দেশই মনে নেবে না, ভারত তো নয়ই। ফলে মুহাম্মদ ইউনূসের সামনে এখন এটাই বড় চ্যালেঞ্জ, জামাত-সহ ইসলামিক দলগুলির রক্তচক্ষু এড়িয়ে আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে সুযোগ করে দেওয়া। আবার আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য শক্তিগুলিকে উপেক্ষা করাও তাঁর কতটা সাহস হবে সেটাও একটা প্রশ্ন।












Discussion about this post