মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সেনাবাহিনীর কোনও মতপার্থক্য বা বিভেদ নেই বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। গত সোমবার সেনা সদরে এক সাংবাদিক সম্মেলনে এমনটাই দাবি করেছিল বাংলাদেশ সেনা। কিন্তু আদৌ কি তাই? সাধারণত বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনও ইস্যুতে সাংবাদিক সম্মেলন করেন বাংলাদেশের সেনাপ্রধান। অথবা সেনার জনসংযোগ দফতরের তরফ থেকে প্রেস বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। কিন্তু গত সোমবার নজিরবিহীনভাবে সেনাবাহিনীর তরফে দুজন আধিকারিককে দিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করানো হল। সাম্প্রতিক সময়ে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ জামান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমানের মধ্যে সংঘাত বিষয়ে এই সংবাদ সম্মেলন যথেষ্টই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কারণ, সেনাবাহিনী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এবার থেকে সেনার তরফে নিয়মিত সাংবাদিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। তাহলে কি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পাত্তা দিতে নারাজ সেনা? এই আশঙ্কা কিন্তু থেকেই গেল।
সেনাবাহিনীর মিলিটারি অপারেশনের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. নাজিম-উদ-দৌলা এবং সেনা সদরের মিলিটারি অপারেশন্স ডাইরেক্টরেটের কর্নেল স্টাফ কর্নেল মো. শফিকুল ইসলাম এই সাংবাদিক সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন। প্রসঙ্গত, গত ২১ মে ঢাকা সেনানিবাসের সেনা প্রাঙ্গণে ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান যে বক্তব্য দিয়েছিলেন, সেখানে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন ছাড়াও করিডোর, বন্দর হস্তান্তর, সংবিধান ও নির্বাচন সংস্কারের মতো বিষয় উঠে আসে। সেনাপ্রধানের বিভিন্ন মন্তব্য দেশ-বিদেশের সংবাদমাধ্যমে ফলাও করেই প্রকাশিত হয়। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সেনাপ্রধানের বক্তব্য ঘিরে দেশের রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছিল নানা আলোচনা। এই আবহেই আচমকা সেনাবাহিনীর তরফে সাংবাদিক সম্মেলন। মজার বিষয় হল, সেনাবাহিনী দাবি করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সেনাবাহিনী একে অপরের বিপরীতে কখনই দাঁড়ায়নি এবং একসঙ্গে কাজ করছে। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তাঁরা কার্যত স্বীকার করে নেয়, ‘অফিসার্স অ্যাড্রেস’ অনুষ্ঠানে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের বক্তব্যের নির্যাস নিয়ে সংবাদের সত্যতা। যেমন, রাখাইন করিডোর নিয়ে সরকার ও সেনার সংঘাত প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী স্পষ্ট জানায়, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়– এমন কোনো বিষয়ে সেনাবাহিনী কখনোই সম্পৃক্ত হবে না। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, চট্টগ্রাম বন্দর ও করিডোর নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনা প্রসঙ্গে সেনা সদরের পক্ষ থেকে এ কথা জানানো হয়।
অন্যদিকে ভারতের চিকেন নেক শিলিগুড়ি করিডোরের নাকের ডগায় লালমনিরহাটে যে পুরোনো বিমানঘাঁটিটি নতুন করে তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা নিয়েও সেনাবাহিনী তাঁদের অবস্থান স্পষ্ট করল।
অন্যদিকে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে সম্প্রতি পুশ-ইন করা নিয়েও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। ব্রিগেডিয়ার মো. নাজিম উদ দৌলা এ প্রসঙ্গে বলেন, এমনটা হতে থাকবে আর আমরা বসে থাকবো এটা ভাবার কোনও কারণ নেই।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের, পাহাড়ে সশস্ত্র সংগঠন কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের ৩০ হাজার ইউনিফর্ম বানানোর বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছে সেনাবাহিনী। সেটাও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি স্টারলিংক ও বন্দর হস্তান্তর প্রসঙ্গে সেনাবাহিনী দ্যার্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয়, এমন কোনো বিষয়ে সেনাবাহিনী সম্পৃক্ত হবে না। অর্থাৎ, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল মুহাম্মদ ইউনূসের তদারকি সরকারকে। যাতে তাঁরা নিজেদের এক্তিয়ারের মধ্যেই থাকেন। আর দ্রুত নির্বাচনের ব্যবস্থা করে মানে মানে বিদায় নেন। না হলে সেনাবাহিনী যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে সেটাও আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দেওয়া হল।












Discussion about this post