খেলা জমে জমজাট।
খেলছে আমেরিকা, বাংলাদেশের সঙ্গে। খেলাটা কীরকম, সে বিষয়ে যাওয়ার আগে হেনরি কিসিঞ্জার নিয়ে কিছু কথা।
আমেরিকাকে নখদর্পণে যদি কেউ চিনে থাকেন, তাহলে হেনরি কিসিঞ্জার। নিজের দেশ সম্পর্কে তিনি বেশ কিছু অপ্রিয় সত্য বলে গিয়েছেন। তার জন্য তাঁর সমোলাচনা হয়নি, এমনটা নয়। কিন্তু সত্য সেটা অপ্রিয় হলেও সত্য। একে কোনওভাবে চেপে রাখা যায় না। ওনার সম্পর্কে কয়েকটি কথা বলা দরকার। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা পরামর্শদাতা ছিলেন। প্রেসিডেন্ট নিক্সন এবং প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ড সরকারের আমলে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার পরে নিজের দেশ সম্পর্কে তিনি যা বলে গিয়েছেন, সেটা চিরকালীন সত্য হয়ে থেকে যাবে। আমেরিকা সম্পর্ক তাঁর দুটি পর্যবেক্ষণ বেশ অনুধাবনযোগ্য। একটি “America has no permanent friends or enemies, only interests”। আর দ্বিতীয়টি হল “It may be dangerous to be America’s enemy, but to be America’s friend is fatal.”
বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার যে স্বার্থ ভীষণভাবে জড়িয়ে রয়েছে, তা আগেও প্রমাণিত হয়েছে। এবার ভোটের আবহে সেটা আরও একবার প্রমাণিত হল। ওয়াশিটন থেকে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে দুই দুঁদে কুটনীতিককে। এরা হলেন অ্যালবার্ট গম্বিস এবং মর্স ট্যান। তারা তদারকি সরকার প্রধান মুহম্মদ ইউনূসের সঙ্গে দেখা করেছেন। বৈঠক হয়েছে রাষ্ট্রীয় অতিথি নিবাস যমুনায়। মূলত আওয়ামী লীগ নিয়ে তদারকি সরকারের অবস্থান কী, সেটা জানার উদ্দেশ্য নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই দুই দুঁদে আমলাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন।
বৈঠক হয়েছে প্রায় এক ঘণ্টা। বৈঠকে প্রধান উপদেষ্টা ও সফররত কূটনীতিকরা আসন্ন নির্বাচন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও এর পরবর্তী পরিস্থিতি, তরুণ আন্দোলনকারীদের উত্থান, জুলাই সনদ ও গণভোট, নির্বাচনকে লক্ষ্য করে ছড়ানো ভুয়া খবর, রোহিঙ্গা সংকট এবং জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’ এর সম্ভাবনাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। ইউনূস তাঁদের বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগের কোনও অনুসোচনা নেই। তাই, রাজনীতিতে তাদের ফেরাতে ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া এই মুহূর্তে সম্ভব নয়।
‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেয়শন’ বলতে কী বোঝায়, সেটা এই ফাঁকে জানিয়ে দেওয়া যাক। এটি মূলত আদালতের বাইরের সত্য-অনুসন্ধান এবং নিরাময় প্রক্রিয়া। কোনো দেশে গণহত্যা, গৃহযুদ্ধ, জাতিগত নিপীড়ন বা দীর্ঘস্থায়ী মানবাধিকার লঙ্ঘনের পর গঠিত হয় ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলেয়শন। এর উদ্দেশ্যে অতীতে কী ঘটেছিল, তা দলিল-প্রমাণসহ তুলে আনা। এতে অপরাধীরা সত্য স্বীকার করলে কখনও কখনও শাস্তিমুক্তি পেতে পারেন। এই ধরনের কমিশনের মাধ্যমে বিভক্ত জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের দীর্ঘ শাসনের পর ক্ষমতায় এসে কিংবদন্তি নেতা নেলসন ম্যান্ডেলা এই ধরনের কমিশন করেছিলেন। কমিশনে শ্বেতাঙ্গরা শতবর্ষ ধরে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর চালানো আক্রমণের কথা স্বীকার করে নেন। আর কৃষ্ণাঙ্গদের তরফ থেকেও শ্বেতাঙ্গদের ক্ষমা করার কথা বলা হয়। রুয়ান্ডা গণহত্যার পর গাচাচা কোর্টও রিকনসিলিয়েশন উদ্যোগ। চিলি ও আর্জেন্টিনার সামরিক শাসনের নির্যাতনের পরও রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠন হয়।
২০২৫ সালের ১০ মে রাজধানীতে এক আলোচনায় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলও এ বিষয়ে কথা বলেন। সেদিন তিনি বলেন, “ট্রুথ জাস্টিস কমিশন অথবা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ এর খুব দরকার আছে। সম্ভবত এটা আমাদের দেশে ১৯৭২ সাল থেকেই থাকলে ভালো হতো। আমরা সবকিছুই খুব পেশাদারভাবে নিষ্পত্তি করতে চাই। আমরা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ করব।” নেলসন ম্যান্ডেলার আমলে করা সেই ট্রুথ ও রিকনসিলিয়েশন কমিশনের বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য প্রধান বিচারপতিসহ একটি দল নিয়ে সাউথ আফ্রিকা সফরের ঘোষণাও করেন আসিফ নজরুল। আইন উপদেষ্টা বলেন, “আমরা ফিরে এসে এ বিষয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করব।”
তদারকি সরকার প্রধান দুই প্রাক্তন মার্কিন কূটনীতিককে বলেন, প্রয়াত নেলসন ম্যান্ডেলার একজন বন্ধু হিসেবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন প্রক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে দেখেছেন। তবে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট শাসক তাদের অপরাধ অস্বীকার করে যাওয়ায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সে ধরনের কোনও উদ্যোগ গ্রহণের সম্ভাবা নেই। প্রধান উপদেষ্টা স্পষ্ট ভাষায় প্রাক্তন দুই মার্কিন কুটনীতিকে বলেছেন, ভোট হবে যথাসময়ে। না একদিন আগে, না একদিন পরে।
আবার বাংলাদেশের জাতীয় রাজনীতিতে ফিরে এসেছে ডিপ স্টেট। জুলাই অভ্যুত্থান ও পরবর্তী পর্যায়ে হাসিনা সরকারের পতনের পর এসেছিল ডিপ স্টেটের...
Read more












Discussion about this post