মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের লড়াই যে এক অসম যুদ্ধ, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। এ লডা়ই এক পেশে। আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দেওয়া আমেরিকার পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইজরায়েলের সঙ্গে সমান তালে লড়াই করছে ইরান। এতোদিন মধ্যপ্রাচ্যে মাথা উঁচু করে যে সব মার্কিন ঘাঁটি ছিল, ইরান সেই সব মার্কিন ঘাঁটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আকাশেই তারা ধ্বংস করছে মার্কিন অহমিকা। মিশিয়ে দিচ্ছে একের পর এক যুদ্ধবিমান। ইরান বার্তা আমেরিকাকে এই বার্তাই দিচ্ছে, এটা ভেনেজুয়েলা নয়। দেশটার নাম ইরান। প্রশ্ন হচ্ছে শক্তিমত্তার বিচারে ইরান তেহরানের থেকে অনেকাংশে পিছিয়ে থেকেও কীভাবে আমেরিকার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলেছে? কারা রয়েছে ইরানের পিছনে? কারা ইরানকে মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে রসদ জুগিয়ে চলেছে?
খোলা চোখে দেখলে ধরা পড়বে যে ইরান একা লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অন্দরের খবর হল ইরানকে প্রযুক্তিগত দিক থেকে সাহায্য করে চলেছে চিন ও রাশিয়া। ইরানের হাতে তারা তুলে দিয়েছে প্রযুক্তির এক অদৃশ্য দেওয়াল। ফলে, ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই করা আমেরিকার কাছে ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, চিন বা রাশিয়া সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নিলেও তেহরানকে আধুনিক মিসাইল গাইডেন্স ও জ্যামিং সিস্টেম সরবরাহ করছে। বিশেষ করে চিনের বিশাল স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক এক বিশ্বস্ত পাহারাদের মতো কাজ করছে। ফলে, ওয়াশিংটন বা তেল আভিব যখনই কোথাও কোনও সেনা মোতায়েন করছেন বা যুদ্ধজাহাজ সরাচ্ছে, মুহূর্তের মধ্যে সেই তথ্য ধারণ করে শব্দের চেয়েও দ্রুত গতিতে পৌঁছে দিচ্ছে ইরানের কাছে। সংবাদভিত্তিক ম্যাগাজিন দ্য ক্র্যাডেল চিন তাদের উচ্চপ্রযুক্তির মাধ্যমে কাতার, জর্ডন এবং সৌদি আরবে থাকা মার্কিন ঘাঁটির উচ্চ রেজলেউশনের ছবি এবং লক্ষ্যবস্তুর ডেটা ইরানের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। আর সেই ডেটা ব্যবহার করে তেহরান মার্কিন ঘাঁটিতে একের পর এক হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। আর তাতে মার্কিনীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ চওড়া হচ্ছে। এছাড়া এই যুদ্ধে ইরান ব্যবহার করছে চিনের বিডিএস থ্রি নেভিগেশন সিস্টেম। এই পদ্ধতিতে লক্ষ্যবস্তুতে নির্ভুলভাবে আঘাত হানা সম্ভব। চায়না ন্যাশনাল নেভিগেশন অফিস অনুসারে, এটি একটি উচ্চ-নির্ভুলতা, টেকসই এবং নিরাপদ সিস্টেম, যা ২০৩৫ সালের মধ্যে আরও স্মার্ট এবং সমন্বিত ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রতিটি স্যাটেলাইট তার অবস্থান এবং নিখুঁত সময় সম্বলিত সিগন্যাল দ্রুত পাঠাতে থাকে। ফলে, মার্কিন ড্রোন বা মিসাইল জ্যামিং প্রযুক্তি ইরানের ওপর আর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না।
বিবিসির একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চিন এবং ইরান সবসময় বন্ধুসুলভ ছিল। তেহরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেইনি শেষবার ১৯৮৯ সালে চিন গিয়েছিলেন। গ্রেট ওয়ালে তাঁর ছবি তোলা রয়েছে। ২০১৬ সালে শি জিংপিং তেহরান সফরের পর তাদের অংশীদারিত্ব আরও গভীর হয়। ২০২১ সালে দুই দেশ ২৫ বছরের কৌশলগত অংশীদারিত্ব চুক্তি সই করে। চিন ২৫ বছরে ইরানে ৪০০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এর বিনিয়ে ইরান তেল সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দেয়। সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসি অনুসারে ২০২৫ সালে চিন ইরান থেকে প্রতিদিন ১৩.৮ লক্ষ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল আমদানি করেছে। এটা চনের মোট আমদানির প্রায় ১২%। মধ্যপ্রাচের মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে ইরানকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করছে রাশিয়া। গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্টকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। ওই তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে রাশিয়া ইরানকে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও বিমানসহ বিভিন্ন সামরিক স্থাপনার অবস্থান পাঠিয়েছে। এটি এক বড়ো ধরনের প্রচেষ্টা বলেই মনে হচ্ছে।












Discussion about this post